বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় রংপুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে একে একে হত্যা করে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস

0
4

রংপুর নগরীর দাসপাড়া-মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দুই হিন্দু যুবককে আটক করেছে পুলিশ। আটক দুজন জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের আগে ওই বাড়ির ছাদে গিয়ে দুই ব্যক্তি মাদক সেবন করে। এরপর একে একে ঐ পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করে তারা আরও প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ওই বাড়িতেই অবস্থান করে। এ সময় তারা গোসল করে, বাড়িতে থাকা খেজুর ও শসা খায় এবং পরে লুট করা স্বর্ণালংকার নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গত ২৩ আগস্ট রবিবার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, আটক দুই হিন্দু যুবকের নাম মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস। তারা পরস্পরের আত্মীয় এবং একই এলাকার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে একজন স্থানীয় একটি স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করে।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, পাশের একটি নির্মাণাধীন বাড়ির ভেতর দিয়ে ওই দুই ব্যক্তি গণপতি চক্রবর্তীদের বাড়ির ছাদে ওঠে। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করে। শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গেলে ওই দুই ব্যক্তির সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়।

এ সময় গণপতি চক্রবর্তীর গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তিনি বাঁচার চেষ্টা করলে শব্দ হয়। সেই শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করলে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এরপর প্রীতিলতার চিৎকার শুনে মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এগিয়ে এলে তাকেও রশি দিয়ে পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ঐ দুই যুবক।

রংপুর ডিবির ডিসি সনাতন চক্রবর্তী জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে আটক দুজন ঘটনার পর আরও ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ওই বাড়িতে অবস্থান করার কথা স্বীকার করেছে। সে জানায়, দুজনকে একসঙ্গে এবং আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই তাদের দেওয়া তথ্যের মধ্যে মিল পাওয়া গেছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর ওই দুই ব্যক্তি বাড়ির একটি বাথরুমে গিয়ে গোসল করে। এরপর ডাইনিং টেবিলে থাকা খেজুর খায় এবং পরে ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খায়। ঘটনাস্থলে ইয়াবা সেবনের আলামতও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

পুলিশ কমিশনার বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর তারা বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করে রাখে। বাড়িতে থাকা দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে বালতির মধ্যে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও জানায় পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, বাড়ি থেকে নেওয়া কিছু স্বর্ণালংকার পরে একটি মন্দিরের পেছনের পরিত্যক্ত জায়গায় রেখে যায় সন্দেহভাজনরা। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ওই স্থান থেকে স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ কমিশনার বলেন, ঘটনাস্থলে আগুনে পরীক্ষা করা চুড়ির আলামতও পাওয়া গেছে। এসব আলামত বিশ্লেষণ করে স্বর্ণের বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন বলে তাদের ধারণা হয়।

উল্লেখ্য , শনিবার (২২ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে রংপুর নগরীর দাসপাড়া-মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি দোতলা বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করতেন। তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় বসবাস করতেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, লাশগুলোতে পচন ধরেছিল এবং পুরো বাড়িতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সঙ্গে তাদের সর্বশেষ কথা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তার বোন পূজা চক্রবর্তী। এরপর শনিবার পর্যন্ত তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে স্বজনেরা ওই বাড়িতে এসে মূল দরজা বন্ধ দেখতে পান এবং পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ গিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে একে একে চারটি লাশ উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছিলেন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী।

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তী একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন এবং কারও সঙ্গে তার কোনো বিরোধ ছিল না। তারপরও এত বড় হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটল, তা অনুসন্ধানে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে মাদক সেবনের আলামত, খেজুরের বিচি, শসা খাওয়ার আলামতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পাওয়া যায়। এসব আলামত এবং তদন্তের তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন দুজনকে শনাক্ত ও আটক করা সম্ভব হয়েছে।


তথ্যসূত্র:
১। চারজনকে হত্যার পর সেই বাসায় গোসল করে খেজুর ও শসা খান খুনিরা
– https://tinyurl.com/bdceeutk

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধগত ৫ বছরে বিয়ের ফাঁদে ফেলে চীনে পাচার হয়েছে ৪২২৬ বাংলাদেশি নারী, চেতনানাশক খাইয়ে আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ অনেকের