রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক-কারিগরি সহযোগিতা চুক্তি; আফগানিস্তানের নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন অধ্যায়

0
15

বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রগুলোর স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ক্রমবর্ধমানভাবে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কৌশলগত সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশই নির্ভরশীলতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখনও শক্তির রাজনীতি প্রভাব বিস্তার করে চলেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই দেশগুলোর প্রভাব ও অবস্থান নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। এ কারণেই সামরিক শক্তি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি আজও প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য প্রয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জাতীয় অস্তিত্ব ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষার অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি। যে দেশগুলো এ ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ে, তারা অবধারিতভাবে বহিরাগত চাপ ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হয়। এমন প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তান বর্তমানে একটি নতুন রাজনৈতিক পর্যায়ে প্রবেশ করছে। রাশিয়ার সঙ্গে ইমারাতে ইসলামিয়ার সাম্প্রতিক সামরিক-কারিগরি সহযোগিতা চুক্তিকে এই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরই বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই চুক্তি প্রমাণ করে যে, ইমারাতে ইসলামিয়া দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা থেকে আফগানিস্তানকে বের করে এনে আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি সক্রিয় অংশে পরিণত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

একই সঙ্গে ইমারাতে ইসলামিয়া তার বৈদেশিক নীতিতে ভারসাম্য আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সক্রিয় ও উদ্দেশ্যমূলক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় রাশিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত এই চুক্তিকে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা সক্ষমতা শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি এটিকে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার একটি পরিমিত ও দূরদর্শী প্রচেষ্টা হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।

দীর্ঘ সময় ধরে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তার ক্ষেত্রে আফগানিস্তান নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি ছিল। এ ধরনের সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে দেশটি তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সক্রিয় করার সুযোগ পাবে এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিকল্প ও আনুষ্ঠানিক পথ উন্মুক্ত হবে। এর ফলে দেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আফগানিস্তান ও রাশিয়ার মধ্যকার সামরিক-কারিগরি সহযোগিতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ এ ধরনের সম্পর্ক নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা আরও গভীর করে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ইমারাতে ইসলামিয়া সীমিত সম্পদ ব্যবহার করেই সমগ্র আফগানিস্তানকে একটি একক নেতৃত্বের অধীনে নিরাপদ রাখতে সক্ষম হয়েছে। দেশের কোথাও নিরাপত্তাহীনতা বা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়নি। বিশেষ করে সীমিত সম্পদ নিয়েই উগ্রপন্থী দাঈশ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সফল অভিযান পরিচালনা করে তাদের উপস্থিতি ও তৎপরতা থেকে আফগানিস্তানকে মুক্ত করা হয়েছে। বিদ্যমান সম্পদের মাধ্যমে দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি হ্রাস করা বর্তমান ব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ও কারিগরি সহযোগিতা সম্প্রসারিত হলে ইমারাতে ইসলামিয়ার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাঠামোর সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অধিকতর সুসংগঠিত, শক্তিশালী ও কার্যকর হয়ে উঠবে।

এছাড়া ইমারাতে ইসলামিয়ার সঙ্গে সম্পদ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। আফগানিস্তানের যে কোনো অঞ্চল থেকে উদ্ভূত সম্ভাব্য হুমকি আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত উপায়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। এর ইতিবাচক প্রভাব সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও পড়বে। ফলে আঞ্চলিক দেশগুলো যেসব নিরাপত্তা হুমকি নিয়ে উদ্বিগ্ন, সেগুলো প্রতিরোধে আফগানিস্তান আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের সক্ষমতা অর্জন করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তানের সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক ও কারিগরি সহযোগিতা সম্প্রসারণ তাদের প্রতিও একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে, যারা দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানকে নিজেদের প্রক্সি যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। বিশেষত পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী, যারা বিভিন্ন সময় বিদেশি স্বার্থ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ উত্থাপন করে থাকে, তাদের জন্যও এই সহযোগিতা নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত বহন করছে। সামগ্রিকভাবে, রাশিয়া ও আফগানিস্তানের মধ্যকার এই সহযোগিতা চুক্তিকে দেশের নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আফগানিস্তানের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।


তথ্যসূত্র
1. The Necessity of the Current Military-Technical Cooperation Agreement Between the Islamic Emirate and Russia
– https://tinyurl.com/466bweyp

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধছেলেরা যুগ্মসচিব-বুয়েটের শিক্ষক, নিঃসঙ্গ বাসায় মরে পচে গেছে বৃদ্ধ মা, খোঁজ নেয়নি কেউই
পরবর্তী নিবন্ধমাতৃমৃত্যু বিষয়ে OCHA প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করল ইমারাতে ইসলামিয়ার জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়