অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ঢাকতে আফগানিস্তানে নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে দুর্বৃত্ত পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী

0
30

আল ফিরদাউস এর সম্পাদক মুহতারাম ইবরাহীম হাসান হাফিযাহুল্লাহ’র কলাম

ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের কুনার, খোস্ত ও পাকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানি সন্ত্রাসী সামরিক বাহিনীর চালানো সাম্প্রতিক বর্বর বিমান হামলা আবারও প্রমাণ করেছে, সন্ত্রাস দমনের নামে নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বলপ্রয়োগের পুরোনো কৌশল কতটা ব্যর্থ ও অন্ধকার। আফগানিস্তানে বোমাবর্ষণকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার অসারতা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠীর সাম্প্রতিক এ বিমান হামলার মাধ্যমে।

৯ জুন, মঙ্গলবার রাতে আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশ, খোস্ত প্রদেশ এবং পাকতিকা প্রদেশের বেসামরিক এলাকাগুলোতে পাকিস্তানি সন্ত্রাসী সেনাবাহিনী বর্বর হামলায় ১১ শিশু, একজন নারী এবং একজন বৃদ্ধসহ মোট ১৯ জন শহীদ হয়েছেন। এছাড়া আরও বহু নারী ও শিশু আহত হয়েছেন।

ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে আফগান ভূখণ্ডে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে কোনো স্থায়ী লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। বিশ্বের পরাশক্তিগুলো অতীতে একই কৌশল অবলম্বন করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের অর্জন ছিল পরাজয় ছাড়া আর কিছুই নয়। আজ এমন এক সময়ে যখন পাকিস্তান নিজেই অর্থনৈতিক স্থবিরতা, আর্থিক চাপ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তাজনিত সংকটের মুখোমুখি, তখন আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ মূলত নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকটকে বাইরে স্থানান্তরের একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা। এ ধরনের হামলা পাকিস্তানের সীমান্তকে নিরাপদ করতে পারবে না, যেমন পারবে না দেশটির ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর সমাধান দিতে।

আফগান ভূখণ্ডে ধারাবাহিক অনুপ্রবেশ এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা ইসলামী ও মানবিক সকল নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। পাকতিকা প্রদেশ, খোস্ত প্রদেশ এবং কুনার প্রদেশে যেসব ঘরবাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে, সেগুলো কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না। সেখানে বসবাস করতেন সাধারণ আফগান নাগরিকরা। যুদ্ধ কিংবা রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে যাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না, এমন শিশুরাও এ হামলার শিকার হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা আড়াল করতে বহির্মুখী সংকট সৃষ্টির নীতি অনুসরণ করে আসছে। যখনই তারা রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট বা নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, তখনই আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে প্রচারণা ও সামরিক পদক্ষেপের আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ ধরনের নীতি তাদের সংকট আরও গভীর করেছে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো পর্যন্ত বহু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তি আফগানিস্তানে বলপ্রয়োগ, বোমাবর্ষণ এবং সামরিক চাপের মাধ্যমে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আফগান জাতির দৃঢ় সংকল্পকে বোমার শক্তি দিয়ে দমন করার প্রতিটি প্রচেষ্টার পরিণতি হয়েছে রাজনৈতিক, সামরিক ও নৈতিক পরাজয়ে। পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের উপলব্ধি করা উচিত যে, আফগানিস্তানের বেসামরিক এলাকায় হামলা চালানো মানে সেই ব্যর্থ পরীক্ষাগুলোরই পুনরাবৃত্তি, যেগুলো অতীতে পরাশক্তিগুলোর পরিকল্পনাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল। আফগানের মুসলমানদের ধৈর্য ও সহনশীলতার পরীক্ষা কতটা ব্যয়বহুল হতে পারে, তা কি এখনো স্পষ্ট হয়নি?

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পরিচালিত পাল্টা অভিযানের জবাবে আফগান পক্ষ ইতোমধ্যে দেখিয়েছে যে নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। যদি কেউ মনে করে শিশু ও নিরীহ মানুষের রক্তের কোনো জবাব হবে না কিংবা আফগানিস্তান ধারাবাহিক আগ্রাসনের মুখেও নীরব থাকবে, তবে তারা বর্তমান আঞ্চলিক বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞ।

যদি পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনের নীতি অব্যাহত রাখে, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতির আরও অবনতির দায় সম্পূর্ণভাবে তাদের ওপরই বর্তাবে। পাকিস্তানের মনে রাখা উচিত, নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকটের সমাধান প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মাধ্যমে সম্ভব নয়।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ যুদ্ধ বা সংঘাত চায় না। উভয় দেশের মানুষ শান্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সম্পর্কের পক্ষে। কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্রিক কিছু মহল, যারা নিজেদের টিকে থাকার পথ সংঘাতের মধ্যেই খুঁজে পায়, তারাই বারবার এমন কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নেয়। বেসামরিক জনগণের ওপর বোমাবর্ষণ এবং নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরানোর কোনো বৈধতা নেই এবং কোনো ন্যায়সঙ্গত উদ্দেশ্য দিয়েই তা সমর্থন করা যায় না।


তথ্যসূত্র
1. The Futility of Bombing as a Strategy in Afghanistan
– https://tinyurl.com/mxwtjwvd

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধইমারাতে ইসলামিয়ার প্রচেষ্টায় পাকিস্তানের কারাগার থেকে ৮০০ আফগান নাগরিক মুক্ত
পরবর্তী নিবন্ধসোমালিয়ায় শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে হারাকাতুশ শাবাবের ৯টি পৃথক অভিযান: হতাহত কয়েক ডজন