“হে পথিক! দাঁড়াও, দিল্লি কুতুব মিনারের আত্মকথা শোনে যাও”

0
857

শহর বলে কথা। ব্যস্ত জীবন, ব্যস্ত নগরী। তাও আবার ছিমছাম ছোট্ট শহর নয়, ভাগ্যান্বেষী অগণিত মানুষের দিল্লী শহর। আযানডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কর্মব্যস্ত মানুষ ও নানা রকম যান বাহনের বিরক্তিকর শব্দদূষণ চলতে থাকে। এসবের মাঝে কতক্ষণ আর এক ধ্যানে কাজ করা যায়। নাহ! মনে হচ্ছে মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। কী করা যায়। হ্যাঁ, কিছু সময়ের জন্য অবকাশ চাই। দেহ মন দু’টোই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু একেবারে অলস ভাবেও তো সময় কাটানো মুশকিল- এতে তো কুড়েমি পেয়ে বসবে। কোথাও ঘুরে এলে কেমন হয়? ঐতিহাসিক কোন স্থানে? হ্যাঁ, তাই বরং ভালো।

অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করলাম কুতুব মিনার যাবো। এতে একই সঙ্গে দুই কাজ হবে। বিনোদন ও মুসলিম শাসনের স্মৃতিচারণ। দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য দিল্লীর উপকণ্ঠে অবস্থিত কুতুব মিনার। অনেকটা পথ পেরিয়ে পৌঁছুলাম কুতুব মিনার। কুতুব মিনার সম্বন্ধে ইতিহাসে যা পড়েছি সবকিছুই এখন আমার স্মৃতিপটে ভেসে উঠছে। এ এক অন্য রকম শিহরণ। প্রথম দর্শনেই আমি অবাক হলাম। গগনছোঁয়া সুবিশাল বপু। দৃষ্টিনন্দন ও মহামূল্যবান লাল মর্মর পাথরে নির্মিত তার দেহ খানি। এক কথায় নির্মাণশৈলি ও স্থাপত্য বিদ্যার এক অমর অক্ষয় কীর্তি যেন। সত্যি, এর নির্মাতা ও প্রকৌশলীদের মননশীল রুচিবোধের প্রশংসা করতে হয়। আশ্চর্য! যাদের মেধা, শ্রম ও অর্থ ব্যয়িত হলো এর নির্মাণে তারা আজ কোথায়? তাদের অস্থিমজ্জাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাদের এ কীর্তি এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে আরো বহুকাল এভাবেই সে নিজের অস্তিত্ব অটুট রাখতে পারবে।

মানুষ কত দুর্বল! পক্ষান্তরে তাদের সৃষ্ট পাথুরে একটি মিনার কত মজবুত। মিনারের পাদদেশে নির্মিত থরে থরে সাজানো প্রাসাদ আর মাজারগুলো পরিদর্শন করছি আর এসব ভাবছি। একরকম আচ্ছন্নই ছিলাম। হঠাৎ একটি শব্দ কানে আসতেই বাস্তবে ফিরে এলাম। কে যেন আমাকে ডাকছে। হে পথিক! দাঁড়াও, আমার কথা শোন! কে ডাকছে শোনার জন্য পেছনে ফিরে তাকালাম; কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। একটু অবাকই হলাম। কৌতূহলবশত আশপাশে খুঁজলাম একবার, দুইবার- একি কাউকে তো দেখছি না। আশপাশটা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কাউকে পেলাম না। মানুষ থাকা তো দূরের কথা কাক পক্ষীটিও নেই। পুরো এলাকাটিই একদম নীরব নিস্তব্ধ। বোবা ও বধির প্রস্তর-খণ্ডগুলোই শুধু দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলোতে আমার হাক ডাকের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়ে আমাকেই বিভ্রান্ত করছে।

ধাঁধাঁ ভেবে যখন আবার মিনারদর্শনে মনোনিবেশ করলাম ঠিক তখনই আরেকটি আওয়ায প্রতিধ্বনিত হলো- শোন হে পথিক! এবার স্পষ্ট বুঝতে পারলাম শব্দটি মিনারের দিক থেকে আসছে। তাই মিনারটির কাছাকাছি গিয়ে শব্দের উৎস যে দিকে সে দিকে কান পাতলাম। এ কি আশ্চর্য! এ দেখি মানুষের কণ্ঠ নয় স্বয়ং মিনার কথা বলছে! এমন কাণ্ড কখনও আমি দেখিনি- পাথর কথা বলে। পুনরায় আওয়াজ ভেসে এল, জনাব ভয় পাবেন না, শুনুন! একদম স্পষ্ট, পূর্বাপেক্ষা জোড়ালো। অবাক হবার কী আছে? যে সত্তা প্রত্যেককে বাকশক্তি দেন তিনিই আমাকে বাকশক্তি দিয়েছেন। এতক্ষণ একটু আধটু ভয় কাজ করছিল, একথা শোনার পর অনেকটা কৌতূহলী হয়েই তার বক্তব্য শোনার জন্য দাঁড়িয়ে গেলাম।

মিনার বলা শুরু করলো- আমি একটি মিনার। এখানে অবস্থান করছি সুদীর্ঘ সাত শতাব্দীর অধিক সময় ধরে। এক মুহূর্তের জন্যও এ স্থান ত্যাগ করিনি; এক পলকের জন্যও চোখ বন্ধ করিনি। এ সুদীর্ঘকাল যাবত আমি প্রত্যক্ষ করে চলেছি কালের বিবর্তন ও রাজা বাদশা, আমির উমারাদের পরিবর্তন। যেন আমি কোন কেন্দ্রবিন্দু, যাকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে ঘটনা প্রবাহের চাকা। এই সুদীর্ঘ সময়ে যা দেখেছি তাতে আনন্দিত হওয়ার বিষয় খুব কমই ছিল; পক্ষান্তরে ব্যাথা ও বেদনার বিষয় ছিল অনেক যা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। আল্লাহ আমাকে পাষাণ পাথর বানিয়েছেন বলেই বোধহয় এখনও স্থির রয়েছি, আর না হয় এত কষ্টের ভার সহ্য করা সম্ভব হতো না কিছুতেই। তবে এটা অস্বীকার করা যাবে না কিছুতেই যে, এ সুদীর্ঘ সময়ে আমি ন্যায়পরায়ণ কোন শাসক দেখিনি, সৎ মানুষদের দেখিনি; আলেমদের সংস্পর্শ পাইনি- যাদের দেখে আমার চক্ষু শীতল হয়েছে, কষ্টের ভার কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে।

এবার শুনুন তাহলে আমার ইতিবৃত্ত; জীবনে যা দেখেছি তারই সরল বর্ণনা আপনাকে দিচ্ছি। শুনেছি সুলতান মাহমুদ গজনবী নাকি এ উপমহাদেশটি ইসলামের নামে বিজয় করে উত্তর হতে দক্ষিণ পর্যন্ত সুবিশাল সাম্রাজ্যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতে বহু রাজা বাদশাহর বিশাল বিশাল সৈন্য বাহিনীকে একের পর এক চরমভাবে পরাজিত করেন এবং ইসলাম যে সংখ্যাধিক্যের উপর বিজয় লাভ করে আরেক বার এর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এটা হিজরী পঞ্চম শতাব্দীর শুরুর কথা। এর ঠিক দেড় শতাব্দী পর সুলতান শিহাবুদ্দীন ঘূরী ভারতে অভিযান পরিচালনা করেন। এ অঞ্চলে মুসলমানদের অবস্থান সুসংহত হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অতুলনীয়। তার ত্যাগের বিনিময়ে মুসলমানরা পেয়েছে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র। তবে বাস্তব অর্থে এ দেশকে যিনি বিজয় করেছেন তিনি আর কেউ নন- তাপস সম্রাট শায়খ মুঈনুদ্দীন চিশতী রহ., যার মাধ্যমে হাজার হাজার অমুসলিম ইসলামে দীক্ষিত হয়েছে। মূলত, তাঁর বিচূর্ণ হৃদয়ের বিগলিত দুআ’ই সুলতান ঘূরীর জন্য ঢাল-তরবারীর চে’ বেশি কাজ দিয়েছে।

এসব ঘটনা যখনকার তখন অবশ্য আমি ছিলাম না। কারণ, আমার জন্ম সপ্তম শতাব্দীতে। সুলতান কুতুবুদ্দীন কুওয়াতুল ইসলাম জামে মসজিদের মিনার স্বরূপ আমাকে নির্মাণ করেন। তবে আমার নির্মাণকার্য পরিসমাপ্ত হয় সুলতান শামছুদ্দীনের হাতে। সেই জন্মের পর থেকে আজো পর্যন্ত নিঃসঙ্গতাই যেন আমার সঙ্গী। যাক সে কথা। সুলতান ঘূরীর পর তার ক্রীতদাস শামছুদ্দীন তার স্থলাভিষিক্ত হন। এটাই ইসলামের বিশেষত্ব- কি আযাদ কি দাস কি ধনী কি গরীব, যোগ্যতাই এখানে মূল বিষয়। ৫/৭ বছর নয়, দীর্ঘ ৮৭ বছর পর্যন্ত এ দাস শাসন স্থায়ী হয়। তাদের মাঝে এমন এমন শাসকও ছিলেন, যাদের কীর্তিগাঁথায় ইতিহাস সমুজ্জ্বল হয়েছে। সেনাপতি কুতুবুদ্দীন আইবেক, সুশাসক নাসিরুদ্দীন মাহমূদ আলতামাশ, বাদশা গিয়াসুদ্দীন বলবন সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

সুলতান শামছুদ্দীনের শাসনামলে দিল্লীতে কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী রহ. নামে বড় মাপের একজন শায়খ ছিলেন। ভক্ত-মুরিদদের ভীড় লেগে থাকতো তার খানকাতে। আমি সুলতানকে প্রায়ই রাতের বেলা তার দরবারে গমন করতে দেখতাম। দিবসের প্রতাপশালী বাদশা নিশীথে শায়খের একান্ত খাদেম বনে যেতেন। তার হাত পা দাবিয়ে দিতেন, নিজের গুনাহের কারণে জার জার কাঁদতেন।

এভাবে এক সময় দাসদের রাজত্বের অবসান ঘটে। আর পৃথিবী তো আল্লাহরই। তিনি যাকে চান ক্ষণিকের জন্য তাকে তার রাজত্ব দেন। সময় ফুরিয়ে আসা মাত্রই ছিনিয়ে নেন। কার সাধ্য আছে এর রহস্য উদঘাটন করে? এর পর শুরু হলো ভাঙ্গন। ক্ষমতার মসনদ দখলের লড়াই। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে তারই ভাতিজা কিংবা জামাতা মসনদ দখলের জন্য নৃশংসভাবে হত্যা করছে- এহেন জঘন্য কাণ্ডও আমাকে দেখতে হয়েছে। তবে আলাউদ্দীন খিলজী তার বাবা জালালুদ্দীন খিলজীকে হত্যা করার পর আনেক মহৎ কার্য সম্পাদন করেন। পুরো সম্রাজ্যকে ঢেলে সাজান। ইতোপূর্বে লিখিত কোন সংবিধান ছিল না। তিনি একটি লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করেন। কর আরোপ করেন। দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা বিস্তৃত করেন। সর্বোপরি শাসনক্ষমতাকে একটি মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড় করান। খিলজী শাসকদের রাজত্বকাল স্থায়ী হয় ৩১ বছর।

পৃথিবীতে তো তারই অলঙ্ঘনীয় বিধান বাস্তবায়িত হয়। কখনো একে রাজত্ব দেন তো পরবর্তীতে অন্য কাউকে দেন। খিলজী শাসনের অবসানের পর সিংহাসনে সমাসীন হয় তুঘলক বংশ। এ বংশে মুহাম্মদ তুঘলক নামে একজন শাসক ছিল একটু ভিন্ন প্রাকৃতির। বুদ্ধিমান ছিলেন বটে, তবে কিছুটা একরোখা স্বভাবের। তার মাথায় কী ঢুকেছিল জানি না, হঠাৎ করে তার মন চাইল রাজধানী দৌলাতাবাদে স্থানান্তর করতে। তবে সে এ চেষ্টায় সফল হয়নি। আর আমিও নিঃসঙ্গতা থেকে রক্ষা পেয়েছি। তার মৃত্যুর পর ফিরোজ শাহ নামে তার পরিবারের একজন সৎ যুবক সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি বহু মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। নির্মাণ করেন বহু রাস্তাঘাট ও সরাইখানা। তাছাড়া সন্ত্রাস ও অবৈধ কার্যকলাপ নির্মূল করে শান্তি স্থিতি ফিরিয়ে আনেন।

এ সময় আবির্ভাব ঘটে একজন মহামনীষীর যার নাম নিযামুদ্দীন বাদায়ূনী। তার একটি সমৃদ্ধ বিদ্যাপীঠ ছিল। শত শত তালেবে ইলমের পদচারণায় সদা মুখরিত থাকতো। এক দিকে ফিরোজ শাহের জাগতিক শাসন, অন্য দিকে শায়খ নিযামুদ্দীনের আধ্যাত্মিক শাসন। সম্পূর্ণ ভিন্নধারার দু’টি শাসন পাশাপাশি পরিচালিত হতো। তবে বাস্তবতা হলো, মানুষের মন জয় করার ক্ষেত্রে জাগতিক শাসনের চে’ আধ্যাত্মিক শাসনের কার্যকারিতা অনেক বেশি ছিল। সুদীর্ঘ একশত পয়ত্রিশ বছর একটানা দাপটের সাথে রাজত্ব করে তুঘলক বংশ। অতঃপর তাদের পতন ঘটে।

এরপর ক্ষমতায় আসীন হয় লূধী বংশ। লূধী শাসনের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে আগমন ঘটে সুলতান সেকান্দার লূধীর; যিনি একজন শাসক হওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে একজন সৎ ও সুযোগ্য আলেম ছিলেন। ছিলেন আলেম উলামাদের শুভাকাক্সক্ষী। তার সময়েই জৌনপুর শহরের বিকাশ লাভ করে। অতঃপর ইব্রাহীম শাহ শারকীর রাজত্বকালে (৮০৪ খ্রিষ্টাব্দ-৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) এটি উন্নতির চূড়ায় পৌঁছায়। আমি এ সভ্য নগরের শাসক ও আলেম উলামাদের কথা শুনতাম। যেমন, মালিকুল উলামা কাজী শিহাবুদ্দীন দৌলতাবাদী, শায়খ আবুল ফাতাহ মুকতাদির দেহলভী; আরো অনেকের কথাই বলা যায়। সেখানের মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যশ-খ্যাতির কথাও শুনতাম। আহমেদাবাদ শহরটিও এভাবে বিকাশ লাভ করে। এ শহর তার সুযোগ্য শাসকবর্গ, হাদীস বিশারদ, শিল্পকারখানা ও নয়নাভিরাম অসংখ্য উদ্যান আর সুশৃঙ্খল নগর ব্যবস্থার কারণে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলকে ছাড়িয়ে যায়। জৌনপুরের শাসক মাহমুদ শাহ ও তার সুযোগ্য সন্তান মুজাফ্ফার শাহ হালিমের (৮৬২ খ্রিষ্টাব্দ-৯৩২ খ্রিষ্টাব্দ) কথাও শুনতাম। আমার মনে হতো আমি স্বর্ণযুগের (খায়রুল কুরুনের) শাসকদের কথা শুনছি।

৯৩৩ হিজরীর কথা। দিল্লীর মসনদে তখন লূধী বংশের শাসক ইব্রাহীম লূধী। বিশাল সাম্রাজ্যের দূরদূরান্তের অঞ্চলগুলোর সাথে কেন্দ্রের যোগাযোগ ছিল একরকম বিচ্ছিন্ন। রাষ্ট্রের নিয়ম শৃঙ্খলার অবনতি তলানীতে গিয়ে ঠেকেছিল। বিলাসী জীবন যাপনের ফলে সৈন্যদের মাঝেও ত্যাগ ও দেশপ্রেমের চেতনা নিয়ে দেশরক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়ার মনমানসিকতা একেবারে নিঃশেষ না হলেও আশানুরূপ ছিল না কোন ভাবেই। ঠিক এ সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করেন তৈমুর বংশের শাসক বাবর। কাবুলের এ দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শাসক তার দুর্ধর্ষ বার হাজার সৈন্য নিয়েই আক্রমণ করে বসেন হিন্দুস্তানের উপর। লূধীর লক্ষাধিক সৈন্যের বিশাল বাহিনীর সাথে পানিপথের প্রান্তরে তাদের সংঘর্ষ বাঁধে। উভয় শিবিরে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠে। শুরু হয় তুমুল লড়াই। লূধীর বিশাল সৈন্য বহরের অশ্বারোহীদের ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনিতে মনে হয়েছিল বাবরের মুষ্টিমেয় বাহিনী বুঝি প্রথম তোড়েই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে; কিন্তু বিলাসিতা আর শরাবই যাদের নিত্যসঙ্গী; যুদ্ধের ময়দান তাদের জন্য নয়। ফলে পানিপথের আকাশের ধূলাচ্ছন্ন কুণ্ডলী মিলিয়ে যেতেই দেখা গেল ইব্রাহীম লূধীর বিশাল বাহিনীর কর্তিত লাশের স্তুপ মরুভূমিতে ইতস্তত পড়ে আছে। আর বাবরের ক্ষুদ্র বাহিনীটি অপ্রতিরোধ্যভাবে সামনে এগিয়ে চলছে। লূধীর সৈন্যবাহিনীর যারা বেঁচেছিল তারা কেউ গ্রেফতার হলো কেউ কোনমতে প্রাণ নিয়ে পালালো। এটাকে শুধু পরাজয় নয় বরং চরম পরাজয় বলাই শ্রেয়। আর এভাবেই অবসান ঘটলো লূধী শাসনের।
সম্রাট বাবর ইতিহাস সৃষ্টি করলেন যে সংখ্যাধিক্য নয় দৃঢ় মনোবলই বিজয় এনে দেয়। তার মাধ্যমেই সূচনা হয় ঐতিহ্যবাহী মোঘল শাসনের। সারা বিশ্বে যেমনি তাদের যশখ্যাতি ছিল, তেমনি তাদের অবদান ও কীর্তি এ উপমহাদেশের আনাচে-কানাচে অমর অক্ষয় হয়ে আছে।

তার শাসনকাল ভালই ছিল। বিপত্তিটা ঘটে তার পুত্র হুমায়ুনের সময়ে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সিংহাসনে আসীন হন। শারীরিক গঠন ও পোষাক পরিচ্ছদে ছিলেন অবিকল তার পিতার মত শরীফ। সদ্য অভিষিক্ত হুমায়ুন নিজের রোগমুক্তি ও পিতার মৃত্যুশোক কাটিয়ে না উঠতেই দেখলেন গুজরাট ও বিহারের শাসকগণ বিদ্রোহ করে বসেছে। এহেন অবস্থায় বিজ্ঞের মতই একের পর এক বিদ্রোহ দমন করতে লাগলেন। কিন্তু ১৫৩৯ খ্রিষ্টাব্দে শের শাহ সূরীর বিদ্রোহ ছিল অকল্পনীয়। ফলে উল্টো নিজেই পরাজিত হয়ে ইরানে পালায়ন করেন। দিল্লী ও আগ্রা শের শাহের করতলগত হয়। এ যুদ্ধ মূলত বংশীয় মর্যাদা রক্ষার জন্যই হয়েছিল।
শের শাহ দিল্লীর মসনদে আসীন হয়ে গোটা রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজান। শাসনের সুবিধার্থে প্রত্যেক প্রদেশকে বিভিন্ন স্তরে বিন্যাস করেন। মোটকথা শের শাহ প্রশাসনিক কাঠামোকে এমনভাবে বিন্যস্ত করেন যা ইতোপূর্বে কেউ করতে পারে নি। এমন সব মহান কীর্তি আঞ্জাম দেন, যদি কয়েকজন শাসক মিলেও তা করতো তবুও তা যথেষ্ট বলে বিবেচিত হতো। এতই সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ ছিল তার শাসনব্যবস্থা যে, কাউকে ঘরে খিল বা তালা লাগানোর প্রয়োজন হতো না। লুটতরাজ ও নৈরাজ্য ছিল না। তিনি ছোট বড় অনেক সড়ক নির্মাণ করেন। কলকাতা থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত দীর্ঘ চার মাস সফরের দূরত্ব নির্মিত বিখ্যাত রাস্তাটি তারই অভিনব কীর্তি। শুধু তাই নয় এ রাস্তাটির ধারে ধারে নানা রকম গাছ রোপন করেন। স্থানে স্থানে মসজিদ ও সাধারণের জন্য সরাইখানা নির্মাণ করেন। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যে, এত সব কাজ তিনি মাত্র ৫ বছরেরও কম সময়ে সম্পাদন করেছেন। আরো বড় কিছু করার ইচ্ছাও ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু তার আর সুযোগ হয় নি। হঠাৎ একদিন বারুদের স্তুপে আগুন লেগে যায় এবং তাতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

‘সাহরাম’ শহরের ব্যাপারে আমি বরাবরই ঈর্ষাকাতর। কারণ এটি শের শাহের রাজধানী ছিল এবং এখানেই তাঁর সমাধী। আর এ দৃষ্টিকোণ থেকে দিল্লী সাহরামের পিছনে পড়ে যায়। পক্ষান্তরে ছোট্ট শহর সাহরাম তাকে ছাড়িয়ে যায়। এর পর ১৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দে হুমায়ুন পারস্য সম্রাটের সহযোগিতায় হারানো রাজত্ব পুনরুদ্ধার করেন। এর মাত্র এক বছর পর ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে আকস্মিক এক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তিনি পরপারে পারি জমান। তারপর তার পুত্র আকবর সিংহাসনে আরোহণ করেন। এ লোকটি ছিল একজন মূর্খ ও মাতাল শাসক। ইসলামের সাথে এর ন্যূনতম সম্পর্কও ছিল না। ক্ষমতা আর নারীর মোহ তার এতই প্রকট ছিল যে, এর জন্য সে এক নতুন ধর্মের সৃষ্টি করে- যার নাম দ্বীনে এলাহী। এ ধর্মের(!) রীতি-নীতিতে চরম ইসলাম ও মুসলমান বিদ্বেষই ফুটে উঠেছে। তার সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল আগ্রা। তাই আমি তার অপকর্মের কলঙ্ক থেকে বেঁচে গেছি। তার ব্যাপারে আর কিছু বলতে চাই না। কারণ যাই বলবো তার চে’ ঢের বেশিই হবে তার পাপের ফর্দ।

তার মৃত্যুর পর তার পুত্র জাহাঙ্গীর ১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে আসীন হন। তিনি অবশ্য তার পিতার চে’ অনেক ভাল ছিলেন; তবে তার স্বীয় পুত্র শাহজাহান ও নাতি আওরঙ্গজেব আলমগীরের মত কোনভাবেই ছিলেন না। আকবরের অপকীর্তিগুলো তার সময়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে মহান সংস্কারক মুজাদ্দিদে আলফে ছানী শায়খ আহমাদ সারহিন্দী রহ. তার যুগান্তকারী সংস্কার কর্মে ব্রত হন। একদিকে শাসক শ্রেণীর অবিবেচক ও ধর্মবিরোধী কার্যকলাপে কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে তার প্রতিযোগিতা, অন্য দিকে বিদআত কুসংস্কারে নিমজ্জিত পতিত সমাজ ব্যবস্থা। আশার কোন আলোই যেন দেখা যাচ্ছিল না। এ যেন হাদিসে বর্ণিত ফিতনাতুদ্দুহাইমা। ঠিক এমনই সময়ে আল্লাহ তাআলা মুজাদ্দিদে আলফে ছানীকে পাঠান। আর তিনি এসে পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই পাল্টে দেন। আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে অমানিষার ঘোর আধারে নিমজ্জিত পৃথিবীকে প্রভাতের নির্মল ও স্বর্গীয় আলোয় উদ্ভাসিত করেন। ভণ্ড ও অসৎ পীর-ফকিরদের রাম রাজ্যকে সমূলে উৎপাটন করে সত্য দ্বীনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এ মহামনীষী ১০৩৯ হিজরীতে মুহাম্মদী বয়স ৬৩ বছর বয়সে নশ্বর দুনিয়া ছেড়ে মাহবুবের কাছে চলে যান।

মুজাদ্দেদে আলফে ছানী রহ. এর সমসাময়িক যুগে হিন্দুস্তানে আরেকজন মহান আলেমের আগমন ঘটে। যার নাম আল্লামা আব্দুল হক বুখারী রহ.। তিনি সুদীর্ঘকাল ইলমে হাদিসের খেদমত আঞ্জাম দেয়ার পাশাপাশি নানা বিষয়ে মূল্যবান কিতাবাদিও রচনা করেন। অতঃপর ১০৫২ হিজরীতে ইহধাম ত্যাগ করেন। আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। কারণ, এ মহান সাধক যে আজীবন আমারই পড়শী ছিলেন।

তো বলছিলাম সম্রাট জাহাঙ্গীরের কথা। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে শাহজাহান তার স্থলাভিষিক্ত হন। যিনি হিন্দুস্তানের আনাচে কানাচে নয়নাভিরাম বহু অক্ষয়কীর্তি রেখে গেছেন। যেমন, দিল্লীর জুমআমসজিদ যেটি বিশ্বের সুন্দরতম মসজিদসমূহের একটি। দিল্লীর লাল কেল্লা। প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজের সমাধীতে নির্মিত পৃথিবী বিখ্যাত তাজমহল- এ যেন অনুপম নির্মাণশৈলিতে বাঁধানো মুক্তো। এর সমান্য দর্শন লাভের জন্য হলেও আমি স্বস্থান ছাড়তেও রাজি আছি।

শাহজাহানের পর তার পুত্র সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর তার স্থলাভিষিক্ত হন। তাঁর মত শাসক মোঘল বংশে তো নয়ই ভারতবর্ষের মুসলিম শাসনের সুদীর্ঘ কালে আরেকজন এসেছিলেন কিনা সন্দেহ আছে। তৎকালীন প্রথম সারির ৭০০ আলেম তাঁর নির্দেশেই বিখ্যাত ফতোয়াগ্রন্থ আলমগীরী রচনা করেন। সব ধরনের অবৈধ রাজস্ব বাতিল করেন। জুলুম অত্যাচার নির্মূল করেন। মুশরিকদের উপর জিযিয়া আরোপ করেন এবং তা আদায়ের জন্য নিরীক্ষক নিযুক্ত করেন। সর্বোপরি একটি ইসলমী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।

এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভাগ্যই বলতে হয়; তা না হলে আলমগীরের উত্তরসূরীগণ অধিকাংশই কিন্তু রাজনীতি ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ছিল অযোগ্য। ফলে রাষ্ট্র আর রাজনীতি পরিণত হয় তামাশায়। সকালের রাজা সন্ধ্যায় লাশ হয়ে ফিরতো। পরিধেয় বস্ত্রের মতই তাদের ছুড়ে ফেলা হতো। এসব অথর্ব শাসকদের নামের ফিরিস্তি বলে আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে চাই না। ঐ সময়ের কথা মনে হলে বড় কষ্ট লাগে। সমাজব্যবস্থাই পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। অশ্লীলতা পাপাচার আর বেলেল্লাপনার সয়লাব ঘটে। মদ আর খেল তামাশা ব্যাপকতা লাভ করে। খেলাধূলা আর গান বাদ্যই যেন সবার ধ্যানমন। এ যেন জাহেলী যুগ; কোন নবী বা ওহী মনে হয় তাদের মাঝে আসেনি। তাদের এই দুর্দশা দেখে আমার এ আয়াতটিই স্মরণ হত-
وَ اِذَاۤ اَرَدْنَاۤ اَنْ نُّهْلِکَ قَرْیَۃً اَمَرْنَا مُتْرَفِیْهَا فَفَسَقُوْا فِیْهَا فَحَقَّ عَلَیْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنٰهَا تَدْمِیْرًا
আর যখন আমি কোন জনপদ ধ্বংসের ইচ্ছা করি তখন সে জনপদের বিত্তশীলদের পাপাচারের সুযোগ দিই। ফলে তারা পাপাচারে লিপ্ত হয়; আর আমার শাস্তি তাদের উপর অবধারিত হয়ে যায়। তখন আমি তাদের সমূলে ধ্বংস করি। সূরা ইসরা : ১৬

আমি আল্লাহর গজবের আশঙ্কা করতাম। অধঃপতনের এ ধারা মুহাম্মাদ শাহ এর আমলে (মুত্যু ১১৬১ হিঃ) সকল মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। পাপাচার আর আশ্লীলতার সয়লাব বাঁধ ভেঙ্গে জনপদে আছড়ে পড়ে। মহান আল্লাহ তখন তাদের উপর কঠিন যুদ্ধবাজ কিছু লোককে পাঠালেন। তারা শহর জুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ ও অরাজকতা সৃষ্টি করতে লাগলো। তাদের তাণ্ডব শেষ না হতেই ইরানের সম্রাট নাদেরশাহ দিল্লী আক্রমণ করে বসে এবং গণহারে তাদের হত্যা করতে থাকে। শুধু দিল্লীতেই মৃতের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যায়। বনী আদমের রক্তস্রোতে রাস্তাঘাট ভেসে যায়। নারকীয় এ হত্যাযজ্ঞ তিন দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। মৃত আত্মীয় স্বজনের শোক ও আহতদের দগদগে ক্ষত তখনো কাটেনি। এরই মধ্যে তাদের উপর মারাঠা ও শিখরা দল বেঁধে পৈচাশিক কায়দায় হামলে পড়ে ক্ষুধার্ত রাক্ষসের মত। হত্যা, লুণ্ঠন, অপহরণ, অপমান আর দেশান্তর ছিল তাদের নিত্য নৈমত্তিক ব্যাপার। কত লোকালয় যে সম্পূর্ণরূপে বিরান হয়েছে আর কত মসজিদ যে বিধ্বস্ত হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। যে সকল মসজিদ মুসল্লিদের ইবাদতে সর্বদা আবাদ থাকতো সেগুলো বিরান হয়ে পড়ে। মুসলমানরা তাদের প্রতিরোধ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। ভীতি ও কাপুরুষতা তাদেরকে বিকারগ্রস্ত করে ফেলে। এহেন দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে আল্লাহ এ উপমহাদেশের মুসলমানদের উপর করুণার দৃষ্টি দেন। ফলে আহমাদ শাহ আবদালী -কুদরতের ইশারাই বলতে হবে- এ উপমহাদেশে আগমন করেন এবং হিজরী ১১৭৪ সনে পানিপথের ময়দানে মারাঠাদের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এ যুদ্ধে তাদের দু’লক্ষাধিক সৈন্য নিহত হয়। আহতের সংখ্যা ততোধিক। মারাঠীদের তিনি এমনভাবে পরাজিত করেন যে এর পর আর কোমর সোজা করে দাঁড়ানোর হিম্মত তাদের হয়নি।

গোলযোগপূর্ণ এ সময়ে দিল্লী এক মহা মানবের জন্ম দেয়। তিনি আর কেউ নন- পৃথিবী বিখ্যাত, কালজয়ী পুরুষ শায়খ ওয়ালিউল্লাহ বিন আব্দুর রহীম রহ.। তিনি দ্বীনহারা মুসলমানদের নতুন করে দ্বীনের দিকে আহ্বান করেন। অত্যাচারী শাসকশ্রেণী ও বিদআতী পীর-ফকিরদের খোলাখোলি সমালোচনা করেন। এক দল সুদক্ষ আলেম ও দায়ী তৈরি করেন। শুধু তাই নয় অনেক মহামূল্যবান কিতাবও রচনা করেন। তিনি ও তাঁর সুযোগ্য সন্তানগণ- শায়খ আব্দুল আযীয, শায়খ রফীউদ্দীন, শায়খ ইসমাইল শহীদ -যিনি বালাকোটে সমাহিত- দ্বীনের খেদমতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। তাদের কেউ ছিলেন তরজুমানে কুরআন, কেউ আবার হাদীসের ভাষ্যকার, কেউ বিদগ্ধ ফকীহ, দূরদূরান্ত থেকে এলেম পিপাসুগণ যাদের কাছে এসে ভীড় করতো। কেউ ছিলেন সাধক পুরুষ, তো কেউ হাদীসের মসনদের স্বার্থক মুহাদ্দিস। আবার কেউ বীর মুজাহিদ ও আল্লাহর রাহে শাহাদাত বরণকারী; কেউ বায়তুল্লার মুহাজির। উপমহাদেশ এদের নিয়ে সারা বিশ্বের উপর গর্ব করে বলে- এরাই মোদের পূর্বসূরী পারলে দেখাও তাদের জুড়ি। (অসমাপ্ত)

সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদবী রচিত আল কেরআতুর রাশিদা থেকে অনুবাদ সংগৃহীত

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন