কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা || পর্ব-৮ || বিজবেহারা হত্যাকাণ্ড

0
462

‘কাশ্মীরের ইতিহাস’ এমন এক অধ্যায় যা রচিত হয়েছে কাশ্মীরি মুসলিমদের রক্তপাত, গণহত্যা, গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের ঐতিহ্য দ্বারা। ঠিক এমনই এক রক্তাক্ত দিন ১৯৯৩ সালের ২২শে অক্টোবর, যে দিনটিতে হিন্দুত্ববাদীরা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় কাশ্মীরের বিজবেহারা শহরে, যে দিনটির স্মৃতি আজও গভীরভাবে গেঁথে আছে সকল কাশ্মীরি মুসলিমের হৃদয়ে।

বিজবেহারার মুসলিমরা ২২শে অক্টোবরের দিনকে ‘কালো দিন’ হিসাবে স্মরণ করে। শত শত মুসলিম এদিন ‘শহীদদের কবরস্তানে’ এসে সমবেত হয়। সেই হত্যাকাণ্ডে মৃত ব্যক্তিদের পরিত্যক্ত ঘরগুলির ধ্বংসাবশেষ আজও বিজবেহারাতে দৃশ্যমান; উত্তরাধিকারীদের অনুপস্থিতিতে সেই ধ্বংসাবশেষগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে সেই হত্যাযজ্ঞের একটি স্থায়ী সাক্ষী হয়ে।

বহু বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিনের ভয়ংকর ঘটনার স্মৃতি আজও গেঁথে আছে প্রতিটি কাশ্মীরি মুসলিমের হৃদয়ে। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর বিজবেহারার বাসিন্দাদের কী পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল তা আজও তারা ভুলেনি।

সেদিন বিজবেহারায় একটি মিছিলের উপর হিন্দুত্ববাদী বিএসএফ বাহিনী চারদিক থেকে এলোপাতারি গুলি চালায়। পুরো এক ঘণ্টা তারা জারি রাখে তাদের এই ধ্বংসযজ্ঞ। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিলো যে, সেদিন তাদের বন্দুকের ম্যাগাজিন পর্যন্ত শেষ হয়ে যায়। তাদের এই নির্বিচার হত্যাযজ্ঞে সেদিন প্রাণ হারায় ৫৩ জন নিরীহ কাশ্মীরি মুসলিম। এছাড়াও আহত হয় প্রায় ৩০০ জনেরও বেশি।

১৯৯৩ সালের ৯ অক্টোবর এক বিএসএফের কাছ থেকে বন্দুক চুরি হয়েছে বলে পুরো বিজবেহারা শহরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে অবশ্য হিন্দুত্ববাদীরা তখন খুব বেশি কিছু করতে পারেনি। তবে তাদের মধ্যে জ্বলছিল প্রতিশোধের আগুন। এবং ২২শে অক্টোবর সেই প্রতিশোধের আগুন নেভানোর জন্য তারা পেয়ে যায় তাদের কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সেদিন কাশ্মীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উপাসনালয় ‘হজরতবাল অবরোধের বিরুদ্ধে’ প্রতিবাদ জানাতে স্থানীয় মুসলিমরা শান্তিপূর্ণ মিছিল করেন।

সাধারণ কাশ্মীরি মুসলিমরা যখন মিছিলে স্লোগান দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই হিন্দুত্ববাদী বিএসএফ সদস্যরা মুসলিম বিক্ষোভকারীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। ফলে প্রাণ হারায় ৫৩ জন বেসামরিক মুসলিম।

সেদিন মোহাম্মদ শফি ওয়াগে (১৮) রাস্তা থেকে তার ভাইয়ের মৃতদেহ তুলছিলেন, কারণ একটু আগেই বিএসএফ তার ভাইকে গুলি করে খুন করেছে। গোলাম আহমদ পণ্ডিত (৭০) তার ছেলের মৃতদেহ তোলার চেষ্টা করছিলেন, তার ছেলেকেও গুলি করে খুন করেছে দখলদার হিন্দুত্ববাদী বাহিনী। এমনকি সেদিন হিংস্র বিএসএফের গুলি থেকে রেহাই পায়নি সিকান্দার আহমাদ থোকরু (৪৬) নামের এক পুলিশ সদস্যও।

‘সারা’ নামের এক মুসলিম নারী ঘটনাস্থলে আহত একজনকে পানি দিতে এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু বিএসএফের সন্ত্রাসীরা তাকে দেখতে পেয়ে ঠিক তার গ্লাস ধরা হাতেই গুলি করে। এতে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যান সারা। আজও সেই ক্ষত নিয়েই বেঁচে আছেন তিনি।

পারভেজ আহমেদ দার (১৪) তার আহত চাচাতো ভাইকে তোলার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু বর্বর হিন্দুত্ববাদী বিএসএফের হাত থেকে তিনিও নিস্তার পান নি; তাকেও গুলি করে হিংস্র হিন্দু সেনারা।

কামাল জি কৌল নামের এক হিন্দু সেদিন ঘটনাস্থলে যান তার ভাইকে খুঁজতে। প্রথমে রাস্তায় মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এরপর কিছুটা জ্ঞান আসলে এক বিএসএফ সেনা তাকে দাঁড় করে দেন। কামাল তার জীবনের জন্য অনেক অনুরোধ করে। এমনকি সে এও বলে যে সে হিন্দু। কিন্তু উত্তরে সেই সেনাটি বলে, “এখানে কোনও হিন্দু নেই।” এই বলে কামালকেও গুলি করে খুন করে সেই হিন্দুত্ববাদী সেনাটি।

একটু চিন্তা করুন, ইসলাম এবং মুসলিমদের প্রতি ঠিক কতটুকু শত্রুতা থাকলে, একজন মানুষ হিন্দু না মুসলিম সেই পরিচয় যাচাই না করেই মুসলিম মনে করে সেই মানুষকে খুন করে হিন্দুত্ববাদীরা।

সেদিন আবদুল গণি হাজাম নামের আরেক ব্যক্তি তার আহত ছেলেকে গাড়িতে করে ইসলামাবাদ জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি গাড়িতে আরও ৬ জনকে সাথে নিয়েছিলেন, যারা প্রত্যেকেই ছিলেন আহত। রাস্তায় সেনা সদস্যরা বিনা কারণে ২০ মিনিট ধরে তাদের গাড়িটি আটকে রাখে। ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে গাড়িতেই সেই ৬ জন মারা যায়।

এক নারী প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “আমরা যখন হাসপাতালে পৌঁছাই, তখন গেটে থাকা বিএসএফ কর্মীরা আমাদের ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়। কিন্তু চিকিৎসার অভাবে তার মেয়ের মৃত্যু হোক সেটা আমার মা চাননি। তিনি তার জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং বিএসএফ বাহিনীকে বলেন ‘হয় আমাকে খুন কর নাহলে আমাকে হাসপাতালে ঢুকতে দাও।’ অবস্থা বেগতিক দেখে অবশেষে সন্ত্রাসী বিএসএফ সবাইকে হাসপাতালে ঢোকার অনুমতি দেয়। কিন্তু হাসপাতালে যেয়েও আমাদের তেমন কোন লাভ হয় নি। কারণ সেখানে রোগীদের জন্য কোন সুবিধা ছিল না। পরবর্তীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের ইসলামাবাদের জেলা হাসপাতালে যেতে বলে।”

তিনি আরও জানান, “আমরা যখন জেলা হাসপাতালে যাচ্ছিলাম তখন ‘রাষ্ট্রীয় রাইফেলস বাহিনী’ বিজবেহারার পদশাহি বাগে আমাদের গাড়ি আটকে দেয়। পদশাহি বাগ ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ৩০০ মিটার দূরেই অবস্থিত। গাড়ি থামিয়ে তারা আমাদের জিজ্ঞাসা করে যে ‘কী হয়েছে?’। তারা এমনভাবে আমাদের প্রশ্ন করতে থাকে, যেন তারা এত বড় ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানে না। এরপর তারা আহতদের সবাইকে গাড়ি থেকে নামে আসতে বলে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে যারা ছিল তারা এতে উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং স্বাধীনতার স্লোগান দিতে শুরু করে। এতে রাইফেলস বাহিনী ক্ষুব্ধ হয়ে আমাদের গাড়িতে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। কোনভাবে তখন আমরা সেই জায়গাটি ছেড়ে চলে যাই।”

“খানাবালে এসে আহত ব্যক্তিদের গাড়িগুলি আবারও থামায় হিন্দুত্ববাদীরা। এবার তারা আমাদের পরিচয়পত্র চায় এবং গাড়িতে আহতদের দেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে।”- বলেন সেই নারী প্রত্যক্ষদর্শী।

বিজবেহারা গণহত্যায় নিহত মুসলিমরা

আলী মুহাম্মদ তাক নামের এক মুসলিম সেদিন বিএসএফের গুলিতে তাঁর দুই পা হারান। দুই পায়ে একাধিক গুলি লাগার কারণে তাঁর দুই পা-ই পরবর্তীতে কেটে ফেলতে হয়। সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান আলী মুহাম্মাদ। পঙ্গুত্বের কারণে তাঁকে তাঁর ব্যবসাও একসময় বন্ধ করে দিতে হয়। আজ এই অক্ষমতা নিয়েই তিনি তাঁর জীবনের শেষ সময়টুকু পার করছেন।

মুহাম্মাদ ইউসুফ শাহ্‌ নামের আরেক মুসলিমও সেদিন বিএসএফের গুলিতে পঙ্গু হন। পঙ্গুত্বের কারণে আজ তিনি চরম দারিদ্রতার মধ্যে জীবন-যাপন করছেন।

এই হত্যাযজ্ঞের পরদিন দখলদার প্রশাসন বিজবেহারায় কয়েক দিনের জন্য কারফিউ জারি করে। শহরে মোতায়েন করে হাজার হাজার সেনা। এমনকি সেসময় ফটোসাংবাদিক ও প্রেসকেও শহরে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি তারা।

বিজবেহারায় হত্যাযজ্ঞের ঘটনাটি নিয়ে দখলদার হিন্দুত্ববাদী প্রশাসন পরে লোক দেখানো তদন্তের নির্দেশ দেয়। অবশ্য তদন্ত রিপোর্টটি হিন্দুত্ববাদী সরকারের কাছে জমা দেবার পরও অভিযুক্ত খুনিদের বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। এমনকি কথিত সুপ্রিম কোর্টেও এর কোন বিচার পায় না ভুক্তভোগী মুসলিমরা।

আজ দুই দশক পেরিয়ে গেল। ২২ অক্টোবরের সেই ঘটনা আজও ভুলতে পারেনি বিজবেহারার মুসলিমরা। এখনও সেই দিনটি তাদের তাড়িয়ে বেড়ায় দুঃস্বপ্ন হয়ে। এই গণহত্যায় বেঁচে যাওয়া প্রতিটি মুসলিম দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, কাশ্মীরকে দখলে রাখতে এই হিন্দুত্ববাদীরা ভবিষ্যতে আরও খুন ও গণহত্যা চালাতে কোন দ্বিধাবোধ করবে না।

তাই মুসলিমদের উচিত, কথিত মানবরচিত বিধানকে ছুঁড়ে ফেলে ও মানবতার রক্ষাকারীদের আশায় বসে না থেকে বরং এক আল্লাহ্‌র বিধানকে আঁকড়ে ধরা ও নিজেদের রক্ষার জন্য শত্রুদের বিরুদ্ধে নিজেদেরই প্রতিরোধ গড়ে তোলা।



অনুবাদক ও সংকলক :  আবু-উবায়দা



তথ্যসূত্র:

1. October 22 1993 killings in Bijbehara etched deep in Kashmir’s memory
 https://tinyurl.com/2rpenw9n
2.
Bijbehara Massacre: A survivor remembers
 https://tinyurl.com/mthfs5up



আগের পর্বগুলো পড়ুন

১। কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা ।। পর্ব-১।। চিকিৎসা সেবায় ঘাটতি
https://alfirdaws.org/2022/09/24/59437/

২। কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা।। পর্ব-২।। ধর্ষণ যাদের সংস্কৃতি
https://alfirdaws.org/2022/09/25/59476/

৩। কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা || পর্ব-৩ || নাসরুল্লাহপুরার হত্যাকাণ্ড
https://alfirdaws.org/2022/09/28/59560/

৪। কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা।। পর্ব-৪।। সাফাকাদাল হত্যাকাণ্ড
https://alfirdaws.org/2022/10/04/59692/

৫। কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা।। পর্ব-৫।। সোপোর হত্যাকাণ্ড
https://alfirdaws.org/2022/10/12/59884/

৬। কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা।। পর্ব-৬।। শ্রাবালা হত্যাকাণ্ড
https://alfirdaws.org/2022/10/21/60088/

৭। কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা।। পর্ব-৭।। আশিক হুসাইন মাসুদি হত্যা
https://alfirdaws.org/2022/10/31/60308/

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন