ইসরায়েল থেকে পাকিস্তান— আগ্রাসী মিত্রদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সমর্থন

0
0

আল ফিরদাউস এর সম্পাদক মুহতারাম ইবরাহীম হাসান হাফিযাহুল্লাহ’র কলাম

আফগানিস্তানের বেসামরিক জনগণের ওপর পাকিস্তানের ধারাবাহিক বিমান হামলা, নারী-শিশুসহ নিরীহ মানুষের প্রাণহানি এবং সীমান্ত লঙ্ঘনের ঘটনায় যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক তখনই পাকিস্তানের তথাকথিত ‘আত্মরক্ষার অধিকার’-এর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশ্য সমর্থন নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, ‘আত্মরক্ষার অধিকার’-এর একই যুক্তিকে সামনে রেখে ফিলিস্তিন থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত বেসামরিক মানুষের রক্তে রঞ্জিত সামরিক আগ্রাসনের প্রতি সমর্থন জানানো যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দ্বিমুখী নীতিরই আরেকটি প্রতিফলন। তাদের ভাষ্য, নিরপরাধ নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানির মধ্যেও এমন আগ্রাসনকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা মানবাধিকার, তাদের নিজেদের তৈরি করা আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবিক ন্যায়বিচারের ঘোষিত নীতির সঙ্গে স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক।

বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ইমারাতে ইসলামিয়াকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সীমান্তপারের সামরিক আগ্রাসনের পর ওয়াশিংটনের প্রকাশ্য সমর্থনকে অনেকেই কেবল একটি কূটনৈতিক অবস্থান হিসেবে নয়, বরং ইসলামাবাদের প্রতি রাজনৈতিক প্রশ্রয় হিসেবেও দেখছেন।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকটের দায় আফগানিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে আসছে। অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সীমান্ত অতিক্রম করে সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং বেসামরিক এলাকায় হামলার পুনরাবৃত্তি সেই নীতিরই ধারাবাহিকতা। কিন্তু এসব পদক্ষেপ পাকিস্তানের সংকট সমাধান তো করেইনি, বরং আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও বৃদ্ধি করেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব হামলার প্রধান শিকার হচ্ছেন নিরীহ নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষ। কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নামে আবাসিক এলাকা, গ্রাম কিংবা বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা কথিত আন্তর্জাতিক আইনের‌ও পরিপন্থী। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সকল পক্ষকে কথিত আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানানো। কিন্তু হামলার নিন্দা করার পরিবর্তে একতরফা সমর্থনের ভাষা ব্যবহৃত হলে তা ভবিষ্যতে আরও আগ্রাসী পদক্ষেপের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

সন্ত্রাসী যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কোনো ঘটনা নয়। গাজায় দখলদার ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনও যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সাহায্য ও সমর্থনেরই ফসল। একদিকে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে অবস্থানের কথা বলা হলেও, অন্যদিকে ঘনিষ্ঠ মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সামরিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রের অঘোষিত নীতিরই একটি অংশ। সেই কারণেই অনেকের কাছে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের প্রতি ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক সমর্থন গাজা ইস্যুতে অনুসৃত নীতিরই আরেকটি প্রতিফলন হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

তবে আফগানিস্তানের ইতিহাসও একটি অমোঘ সত্য বহন করে। এই ভূখণ্ডকে সামরিক শক্তি দিয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা বহুবার হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই সেই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। ইতিহাসের এই শিক্ষা উপেক্ষা করে শক্তি প্রদর্শনের নীতি অনুসরণ করলে তা কেবল নতুন সংঘাত, নতুন শোক এবং নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়।

নিরপরাধ নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের রক্তের বিনিময়ে কোনো রাষ্ট্র নিরাপত্তা বা মর্যাদা অর্জন করতে পারে না। কথিত আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতিমালা যদি সত্যিই সর্বজনীন হয়, তবে তার প্রয়োগও হতে হবে সবার ক্ষেত্রে সমান। কিন্তু বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনার মধ্যেও যখন কোনো প্রভাবশালী রাষ্ট্র একতরফাভাবে সামরিক পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানায়, তখন তা ন্যায়বিচারের চেয়ে ভূরাজনৈতিক স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগকে আরও জোরালো করে।


তথ্যসূত্র
1. US says it supports Pakistan’s right to defend itself against ‘terrorist attacks’
– https://tinyurl.com/2cuh6f2n

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধপাকিস্তানে একই সেনা অবস্থান টার্গেট করে আইএমপি মুজাহিদদের চারবার হামলা