পাহাড়ের চূড়ায় কবরস্থান : কাশ্মীরের মৃতরা কোথায় যায়?

1
1322
পাহাড়ের চূড়ায় কবরস্থান : কাশ্মীরের মৃতরা কোথায় যায়?

অশান্ত নীরবতায় নিমজ্জিত কাশ্মীর। এখানে পথে পথে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, তবে লাশগুলো হয়ে যাচ্ছে নিরুদ্দেশ।

সন্তানের লাশ দাফন দেবেন বলে পিতা বাড়ির কাছে কবর খুঁড়েছিলেন। কিন্তু সেই কবরগুলো এখনও খালি পড়ে আছে, ময়লায় পূর্ণ হয়ে রয়েছে। সন্তান ফিরেনি, তার লাশও ফিরেনি।

“আমার সন্তানের বয়স ৩ বছর; আমি কি তাকে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার জন্য লালন করছি?” এক ক্ষিপ্ত মা জানতে চান। এক বোন জানালার পাশে বসে আছেন, তাঁর ভাইয়ের অপেক্ষায়। ভাই ফিরে আসেনি, এমনকি মৃত্যুর পরও নয়।

কান্না চলছে, তবে শোকের উইল নিরুদ্দেশ। কাশ্মীরের মৃতরা কোথায় যায়?

শ্রীনগর থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে উত্তর কাশ্মীরের হান্দওয়ারার ওদ্দার পায়িন গ্রাম। এই গ্রামে কিছু মৃতের সন্ধান পাওয়া গেছে। গ্রামটির এক কিশোরী একদিন প্রথমবারের মতো কোনো মুক্তিকামীর লাশ দেখেছিল। সে জানতো না যে, এই লাশ তাকে চিরজীবনের জন্য পরিবর্তন করে দেবে। সেদিন মানসিক আঘাত নিয়ে সে বাড়ি ফিরেছিল। চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নিহত মুক্তিকামীর মুখ মাসের পর মাস তার সামনে ভেসে ওঠেছিল।

এখনও এটা মাঝেমাঝে তাকে বেদনা দেয়। তবে গ্রামটির প্রায় ৫০০ পরিবারের কাছে মৃত্যুর এই নীরবতা চিরস্থায়ী। মেয়েটির ঘর থেকে বড়োজোর কয়েক মিটার দূরে একটি পাহাড়ের চূড়ায় অনুর্বর এক খণ্ড ভূমি। এখন এটি কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। আর গ্রামটি হয়েছে কাশ্মীরের বিধ্বস্ত সংঘাতের একটি সমাগমস্থল।

পথের শেষ প্রান্তে, দুটি বক্ররেখার মাঝের ঢালু স্থানটি শতাধিক মুক্তিকামীর লাশ দিয়ে ঢাসা হয়েছে। কাশ্মীরজুড়ে গত দুই বছরে দখলদার বাহিনী তাদের হত্যা করেছিল।

ভৌতিক কবরস্থান

২০১৯ সালের আগস্টে নয়াদিল্লির দমনপীড়নের পর, যখন বিজেপি সরকার জম্মু-কাশ্মীরের সীমিত-স্বায়ত্ত্বশাসনও প্রত্যাহার করে এবং এটিকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করে, তখন কথিত জঙ্গীবাদের ব্যাপারেও নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

সংঘর্ষে নিহত মুক্তিকামীদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে দখলদার বাহিনী অস্বীকৃতি জানায়। এই লাশগুলো তারা শ্রীনগর থেকে দূরে উত্তর ও মধ্য কাশ্মীরের দুর্গম অঞ্চলে দাফন করা শুরু করেছিল। এসময় মুক্তিকামীদের লাশ তো বটেই, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু কিংবা বিচার বহির্ভূত বন্দুকযুদ্ধে নিহতদের লাশও দখলদার সরকার ফেরত দেয়নি।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “পূর্বে কর্তৃপক্ষ লাশগুলো দাফন করার জন্য রাজওয়ার জঙ্গলে নিয়ে যেত। এই গহীন জঙ্গলে কোনো মানুষ বাস করেন না। অধিকাংশক্ষেত্রে পুলিশ নিজেরাই শেষকৃত্য সম্পন্ন করতো।”

“দূরবর্তী এলাকাতে, বিশেষভাবে জঙ্গলে তারা একটি কবরে ২-৩টি লাশ একসাথে দাফন করতো।” ওদ্দার পায়িন গ্রামের এক বৃদ্ধ বলছিলেন। তিনি আরও বলেন, “প্রায় দুই বছর আগে, একটি কবরে দুটি লাশ দেখা যায়। কবরটি পানি দিয়ে ভরে গিয়েছিল। তাই, স্থানীয় বাসিন্দারা নতুন জায়গায় লাশগুলো যথাযথভাবে দাফন করেছিলেন।”

গ্রামবাসীরা বলেছেন যে, লাশগুলোর নিরাপত্তাহীনতায় তাঁরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এজন্য তাঁদের গ্রামে নিয়ে আসা মুক্তিকামীদের লাশের মর্যাদাপূর্ণ দাফন নিশ্চিত করতে তাঁরা নিজেদের ভূমি দখলদার সরকারকে দিয়েছিলেন।

গ্রামের এক বাসিন্দা বলেছেন, “সঠিক ইসলামি রীতিনীতি না মেনে মুক্তিকামীদের কবরস্থ করা হতো। এ বিষয়টি আমরা সহ্য করতে পারিনি। তাই সকল গ্রামবাসী একটি সমন্বিত সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, এখানে আনা মুক্তিকামীদের দাফন-কাফন আমরা নিজেরাই করবো।”

অধিকাংশ কবর প্লাস্টিকের শিট দিয়ে ঢাকা। কয়েকটি কবরে নাম, পিতামাতা, বাসস্থান এবং মৃত্যুর তারিখ খোদাই করা স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।

প্রাথমিকভাবে রাজওয়ার জঙ্গলে কবরস্থ করা অনেককে পরবর্তীতে ওদ্দার পায়িন গ্রামের কবরস্থানে স্থানান্তর করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন লশকরে তৈয়্যবার কমান্ডার নাভেদ জাট্ট। এছাড়াও এখানে শায়িত আছেন দক্ষিণ কাশ্মীরের কুলগামের সাবেক ‘দি রেজিস্ট্যান্ট ফ্রন্ট’ কমান্ডার আব্বাস শেখ। গ্রামটির কবরস্থানে এখন ১১৪ মুক্তিকামীর মরদেহ রয়েছে। গত দুই বছর ধরে কাশ্মীর উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল।

মৃতদের অভিভাবক

ঘন ঘন মৃত্যুর উন্মাদ গল্পে কাশ্মীর যখন কবরস্থানের নীরবতায় তলিয়ে যাচ্ছে, ওদ্দার পায়িন গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা তখন মৃতদের অভিভাবক হয়ে ওঠেছেন।

গ্রামটিতে কোনো লাশ এসে পৌঁছালে, স্থানীয় বাসিন্দারা একজন ইমামের নেতৃত্বে জড়ো হয়ে তাঁর জানাযা-দাফন সম্পন্ন করেন। লাশগুলোর জন্য কাফন সর্বদা প্রস্তুত রাখা হয়। এই ঢালু ভূমি এখন স্থানীয়ভাবে ‘শহিদদের কবরস্থান’ নামে পরিচিত।

তবে জানাযা ও দাফনের সময় পুলিশ কাউকে ভিডিও বা ছবি তোলার অনুমতি দেয় না। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেছেন, “আমাদেরকে ছবি কিংবা ভিডিও ধারণের অনুমতি দেওয়া হয় না। আমরা ধর্মানুসারে জানাযা সম্পন্ন করি এবং শ্রদ্ধার সাথে লাশগুলো দাফন করি। এজন্য মাঝে মাঝে জানাযায় অংশগ্রহণকারীদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলবও করা হয়।”

দখলদারদের ভয়ে মানুষ চুপি চুপি এই কবরস্থান কিংবা এর কবরগুলো নিয়ে কথা বলেন। যখন লাশগুলোর পরিবার ওদ্দার পায়িন গ্রামে তাঁদের স্বজনদের কবরস্থ করার ব্যাপারে জানতে পারেন, তখন মাইলের পর মাইল ভ্রমণ করে তাঁরা এখানে হাজির হন।

“তাঁরা সাথে স্মৃতিস্তম্ভও নিয়ে আসেন, আর আমরা তাঁদের সাহায্য করি।” স্থানীয় একজন বলেছেন। “এখন বেশ কয়েকটি কবরে স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে আগুন্তুকদের আমরা পানি, চা কিংবা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস দেই।”

তবে যখন দখলদার বাহিনী পথে পথে টহল দেয়, হয়রানির ভয়ে গ্রামবাসীরা দূরত্ব বজায় রাখেন। আর চারদিকে আবারও নীরবতার বিস্তার ঘটে, যখন কোনো বাবা কবরের পাশে বসে একটু কাঁদতে পারার অপেক্ষায় থাকেন, যখন তিনি শোকাহত হওয়ার প্রতীক্ষায় প্রহর গুণতে থাকেন এবং শপথ করেন, ‘তাঁকে নিস্তব্ধ রাতে নীরবে কবরস্থ করবেন’।

লেখক: ফাহাদ শাহ, প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক, দি কাশ্মীর ওয়াল্লা।

তথ্যসূত্র: Graveyard on a hill: Where do Kashmir’s dead go? https://tinyurl.com/2p8zr6xv

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন