নাট-বল্টু কোটি টাকা কেজি : চোরদের দুর্নীতি আর সিস্টেম কতকাল সইবে জাতি?

0
1080
নাট-বল্টু কোটি টাকা কেজি : চোরদের দুর্নীতি আর সিস্টেম কতকাল সইবে জাতি?

পুকুরচুরি বললেও ভুল হবে, এটা যেন সাগর চুরি।
এদেশের সরকারি প্রকল্পগুলো অবশ্য এমনই লুটপাট আর দুর্নীতির যজ্ঞে পরিণত হয়েছে। রূপপুরের বালিশ কাণ্ড আর লাখ টাকার পর্দার কাহিনীও খুব পুরানো হয়ে যায়নি।
এর মধ্যেই সামনে আসলো শাহজালাল সার কারখানায় কোটি টাকা কেজি দরে লোহা আর স্টিলের নাট-বল্টু কেনার এই দুর্নীতির মহাযজ্ঞ।

সরকার মালিকানাধীন শাহজালাল সার কারখানার জন্য নাট-বল্টু আনা হয়েছে আমেরিকা থেকে। সেই নাট-বল্টু আবার সরবরাহ করেছে মালয়েশিয়ান কোম্পানি। তবে লোহা বা স্টিলের এক কেজি নাটের দাম ১ কোটি টাকা। বল্টুর দাম তার অর্ধেক, প্রতি কেজি ৫০ লাখ টাকা। কেনাকাটার এই মচ্ছব হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডে (এসএফসিএল)।

এই তালিকায় আরও আছে এক্সপেন্ডার হুইল। রাবার ও লোহায় তৈরি ছোট আকারের এই ঘূর্ণমান চাকার কেজি পড়েছে ১ কোটি টাকার বেশি। আধা কেজি ওজনের একটি লোহার স্প্রিংয়ের দাম ১৬ লাখ টাকা। এ রকম অস্বাভাবিক দাম দিতে গিয়ে ২৪৩ কেজি ওজনের এই চালানের খরচ পড়েছে সাড়ে ১৪ কোটি টাকা। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চালানটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস নেওয়া হয়।

কারখানার জন্য কেন আমেরিকান নাট-বল্টু কিনতে হবে? জানতে চাইলে এসএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। বাণিজ্যিক বিভাগ এটি করে।’ তিনি বাণিজ্য বিভাগের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন!

আশ্চর্যজনক কথা অবশ্যই, কারখানার এম.ডি জানেন না যে তার কারখানায় কোন জিনিস কি দরে কেনা হয়েছে। চুরির ভাগ সম্পর্কে সে যদি নাও যেনে থাকে, তবে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন অযোগ্য এম.ডি’র কি করে নিজ দায়িত্বে বহাল থাকে?

তার উপরে কারখানায় শুধু চা-নাস্তা খাওায় খরচ হয়েছে সোয়া কোটি টাকা!

আর এসএফসিএলের বাণিজ্যিক বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার সেরনিয়াবাদ রেজাউল বারী একটি দৈনিক পত্রিকাকে বলেছে, ‘এই কারখানার যন্ত্রপাতি যে দেশের, নিয়ম অনুসারে সেখান থেকেই খুচরা যন্ত্রাংশ কিনতে হবে। সে কারণে আমেরিকান যন্ত্রের জন্য আমেরিকার নির্ধারিত সেই কোম্পানি থেকেই খুচরা যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে। তা ছাড়া এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, আর দাম যা-ই হোক, মানি লন্ডারিংয়ের কোনো সুযোগ নেই।’
এভাবেই লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে প্রশ্নের জবাব দিল সে।

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুল্কায়নের জন্য আমদানি চালানের তথ্য চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে দাখিলের পর অস্বাভাবিক দাম দেখে সন্দেহ করেন কর্মকর্তারা। এরপর চালানটি এক মাস আটকে রাখা হয় বন্দর জেটিতে। পরে পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা যায়, কাগজপত্রে পণ্যের যে পরিমাণ দেওয়া হয়েছে, পণ্য আছে তার কম। আবার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এক পণ্যের, আনা হয়েছে আরেকটি। এ নিয়ে শুল্ক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার কারখানা কর্তৃপক্ষের অন্তত তিন দফায় বৈঠক করতে হয়েছে। সাধারণ কোনো আমদানিকারক এটা করলে ২০০ শতাংশ জরিমানা করা হতো; কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান বলে পার পেয়ে গেছে।

কি প্রকাশ্য নির্লজ্জতা! এতো বড় চুরি ধরা পড়ার পরেও তাদেরকে কোন জরিমানা বা আইনি পদক্ষেপ না নিয়েই ছেড়ে দেওয়া হল, শুধু মাত্র এই কারণে যে, তারা সরকারি প্রতিষ্ঠান। এই কি না দেশের সিস্টেম, আর এই হল সিস্টেমের রক্ষককেরা!

আর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার ফখরুল আলম তো নির্লিপ্তভাবেই বললেন, ‘পণ্যের দামে অসংগতি হলে সেটার দায় আমদানিকারকের। আমরা উপযুক্ত শুল্ক আদায় করেই পণ্য খালাস দিয়েছি।’
তার এই জবাবে এই কাজে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও সন্দেহ জাগে না কি?

তাদের কেনা জিনিশপত্রের চালান ও মূল্যতালিকা দেখলেই ধারণা করা যায় যে, এরা চুরির ক্ষেত্রে এরা কতটা প্রকাশ্য নির্লজ্জতার আশ্রয় নিচ্ছে –

~ সাড়ে পাঁচ কেজির লোহা ও রাবারের এক্সপেন্ডার হুইল সাড়ে ২৩ কোটি টাকা।
~ আধা কেজি ওজনের লোহার স্প্রিংয়ের দাম ১৬ লাখ টাকা।
~ লোহা বা স্টিলের এক কেজি নাটের দাম ১ কোটি টাকা।
~ বল্টুর দাম প্রতি কেজি ৫০ লাখ টাকা।
~ রাবার ও লোহায় তৈরি ছোট আকারের এক্সপেন্ডার হুইলের কেজি পড়েছে ১ কোটি টাকার বেশি।
~ ঘোষণার তুলনায় ২২৩ কেজি ৫৮ গ্রাম পণ্য কম পাওয়া যায়।
~ আধা কেজি ওজনের স্পিং ওয়াশারের মূল্য ধরা হয় ৮ লাখ টাকারও বেশি।

চালানে মোট ১৯ ধরনের পণ্য আছে বলা হলেও বিল দাখিল করা হয়েছে ৭ ধরনের পণ্যের।

এরই হচ্ছে আমাদের দেশ,সরকার ও প্রশাসন পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ, এরা এভাবেই সাধারণ মুসলিমদের সম্পদ লুটে-পুটে খাচ্ছে। আর অন্যদিকে নিজের দু’বেলার দু’মুঠো খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মুসলিমরা।

এভাবেই এরা যুগ যুগ ধরে শুষে চলেছে এদেশের মুসলিমদের। নিজেরা দুর্নীতি আর ক্ষমতা ধরে রাখতে করছে পুকুরচুরি। আর এদেশের শিল্প-বাণিজ্য-ব্যবসা সহ সামরিক খাতকে পর্যন্ত তুলে দিচ্ছে বিদেশীদের হাতে, নিজেদের এই ভোগ-বিলাসিতা আর অন্ধকার জীবনকে নির্বিঘ্ন করতে।

ইসলামি বিশ্লেষকরা তাই বলছেন, এদেশের আপামর মুসলিমকে তাই এখন ভাবতে হবে যে, এরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণভার আর কতকাল এই দুর্নীতিবাজদের হাতে আর এদের ও এদের প্রভুদের তৈরি করা নষ্ট সিস্টেমএর হাতে। এদেরকে আর এদের অন্ধকার সিস্টেমকে উৎখাত না করলে যে এদেশের মুসলিমদের সামাজিক ও আর্থিক মুক্তি মিলবে না – একথাও তারা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন বারবার।


প্রতিবেদক :   আব্দুল্লাহ বিন নজর


তথ্যসূত্র :
———
১। নাট-বল্টুর কেজি কোটি টাকা
https://tinyurl.com/3yy6zwp4

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন