
ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের উপর পাকিস্তানের সন্ত্রাসী সামরিক বাহিনীর নির্বিচার হামলার প্রতিবাদ, এবং পাকিস্তানের দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিজেদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী ইসলামী ইমারাতকে সাহায্য করার প্রত্যয় জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে কায়িদাতুল জিহাদ তথা, আল কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
২৮ এপ্রিল, মঙ্গলবার আল কায়েদার অফিশিয়াল মিডিয়া ‘আস সাহাব’ কর্তৃক প্রকাশিত উক্ত বিবৃতির শুরুতে মহান আল্লাহ্ তাআলার প্রশংসা এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরুদ ও সালাম পেশ করার পর পাকিস্তানের মুসলিম ভাইদের প্রতি সম্বোধন করে বলা হয়, পাকিস্তানের ঈমানদার ভাইদের কাছে এ কথা মোটেও অজানা নয় যে, বর্তমান ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে ‘ইসলামী ইমারত’-ই একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্র, যা মহান আল্লাহ তাঁর পথে পরিচালিত জিহাদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আর এ কারণেই আরব কিংবা অনারব আল্লাহর কোনো শত্রু একে স্বীকৃতি দিচ্ছে না। কারণ, পরিবর্তনের জন্য সংগ্রামরত উম্মাহর সন্তানদের কাছে এই রাষ্ট্রটি আজ এক সমকালীন আদর্শের মূর্ত প্রতীক। অধিকন্তু, যেসব রাষ্ট্র জায়নবাদী-ক্রুসেডার বিশ্বব্যবস্থার ইচ্ছার কাছে মাথা নত করেছে, তাদের সবার জন্যই এই ইমারত এক মারাত্মক হুমকির নাম।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ওইসব রাষ্ট্র জাতিসংঘ এবং তার এমন সব আইনের ছাতার নিচে সংঘবদ্ধ হয়েছে, যা কেবল দুর্বলদের ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর শক্তিশালীদের বেলায় সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়।
এই জায়নবাদী-ক্রুসেডার বিশ্বব্যবস্থা আমাদের ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর ওপর বরাবরই অনগ্রসরতা, মূর্খতা ও দুর্বলতা চাপিয়ে দিয়ে আসছে। তারা আমাদের দেশগুলোকে তাদের এমন সব ধ্বংসাত্মক পণ্যের বাজারে পরিণত করেছে, যা আমাদের দ্বীন, ঈমান, আভিজাত্য ও পৌরুষকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়।
শক্তি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক খাতগুলোতে তারা আমাদের কোনো ধরনের উন্নতির সুযোগ দেয় না। এমনকি দাওয়াত ও জিহাদের মাধ্যমে নববি বার্তার আমানত বহনের উদ্দেশ্যে জনগণকে প্রস্তুত করার কোনো অনুমতিও তাদের কাছ থেকে মেলে না। বরং তারা মুসলিম জাতিকে তাদের সভ্যতা ও ধর্মের মূল কেন্দ্রগুলোতে চরম ভোগ-বিলাস, অসারতা ও তুচ্ছতায় নিমজ্জিত করে রেখেছে। অন্যদিকে, তৃতীয় বিশ্বের বাকি মুসলিম জাতিগুলোকে তারা নিক্ষেপ করেছে চরম দারিদ্র্যের কশাঘাতে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে ইহুদিবাদী মানসিকতার উল্লেখ করে আল কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিবৃতিতে বলেন, আফগানিস্তানের ‘ইসলামী ইমারত’ যেহেতু দ্বীন প্রতিষ্ঠা, ইসলামী রাষ্ট্র গঠন, জনকল্যাণ সাধন এবং দুর্বলদের সাহায্য করার মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে, তাই জায়নবাদী-ক্রুসেডার বিশ্বব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের ওপর কিছুতেই সন্তুষ্ট হতে পারেনি। আর এ কারণেই আমেরিকার উন্মাদ প্রেসিডেন্ট (ডোনাল্ড ট্রাম্প) নির্দেশ দিয়েছে তার আজ্ঞাবহ দাস ও চাটুকার শাহবাজ শরীফ এবং জায়নবাদী মানসিকতার সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে। এই আসিম মুনিরকে তার প্রভু ট্রাম্প ‘বিশ্বস্ত মার্শাল’ বলে আখ্যায়িত করেছে। এরাই আজ পাকিস্তান, এর দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার এবং অপরাধী সেনা নেতৃত্বের ঘাড়ে চেপে বসেছে।
অতীতে আরেক সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফের কুকীর্তি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, দ্বিতীয় ইসলামী ইমারতকে দুর্বল করে এর পতন ঘটানোর হীন উদ্দেশ্যে ট্রাম্প তাদের নির্দেশ দিয়েছে আফগানিস্তানের মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও আগ্রাসন চালাতে। তারা চায়, ইমারত যেন তার আদর্শিক কর্মসূচি, ধর্মীয় ও উন্নয়নমূলক কাজ, উম্মাহর স্বার্থ রক্ষা এবং দুর্বলদের সাহায্য করার মহান লক্ষ থেকে দূরে সরে যায়। অতীতে আমেরিকার আরেক উন্মাদ প্রেসিডেন্ট (জুনিয়র বুশ) ঠিক একইভাবে তার আজ্ঞাবহ দাস (পারভেজ মোশাররফ)-কে নির্দেশ দিয়েছিল। সেও সে সময় পাকিস্তানের ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে প্রথম ইসলামী ইমারতের পতন ঘটাতে আফগানিস্তানের মুসলিমদের তাড়া করেছিল এবং অবরুদ্ধ করে রেখেছিল।
বিবৃতিতে পাকিস্তানের মুসলিম জনগণের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে আরও বলা হয়, এই প্রেক্ষাপটে আমরা পাকিস্তানের ভাইদের স্পষ্টভাবে জানাতে চাই যে, আপনাদের সম্পর্কে আমরা অজ্ঞ নই; বরং আপনাদের আমরা খুব ভালো করেই চিনি। আমরা জানি, ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি আপনাদের হৃদয়ে কতটা গায়রত রয়েছে। আপনাদের বুকের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা এই দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার যা কিছু করছে, তাতে যে আপনাদের বিন্দুমাত্র সম্মতি নেই—তাও আমাদের অজানা নয়। আমরা দৃঢ়তার সাথে বলছি, আপনাদের সাথে আমাদের, ইসলামী ইমারতের এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতের সমস্ত আত্মমর্যাদাবান সন্তানের সম্পর্ক আলহামদুলিল্লাহ উভয়ের হৃদয়ের গভীরতম স্থানে প্রোথিত। কেননা, প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত দৃঢ় ও স্পষ্টভাবে আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন: “হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও।” (সহীহ বুখারী: হাদীস নম্বর ৬০৬৪, সহীহ মুসলিম: হাদীস নম্বর ২৫৬৪)
বিবৃতিতে আল কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পাকিস্তানের সর্বস্তরের ও সকল মতের মানুষের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই দুর্নীতিগ্রস্ত দালাল সরকার এবং আমেরিকার পদলেহনকারী অপরাধী সেনা নেতৃত্ব কখনোই আমাদের ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর চোখে পাকিস্তানের আত্মমর্যাদাবান জনগণের উজ্জ্বল ভাবমূর্তিকে ম্লান করতে পারবে না। আফগানিস্তানের জিহাদে পাকিস্তানি জনগণের সাহায্য, দ্বীনের প্রতি তাদের প্রবল গায়রত এবং আল্লাহর পথে তাদের অসামান্য আত্মত্যাগের বিষয়টি প্রমাণ করতে আমাদের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো বিবৃতি কিংবা ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। তবে আমরা পাকিস্তানের সর্বস্তরের ও সকল মতের মানুষের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি—ক্রুসেডারদের দালাল এই সরকার এবং তাদের সেনা নেতৃত্বের পতন ঘটাতে আপনারা ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ুন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে যে সব দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত পরিবার পালাক্রমে ক্ষমতার মসনদ ও সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দখল করে রেখেছে, তাদের মূলোৎপাটন করুন। এরা আমেরিকা ও ইহুদীদের ঘুষ খেয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। এমনকি দেশের পারমাণবিক কর্মসূচিকেও এরা ইহুদী ও আমেরিকানদের হাতে তুলে দিয়েছে, যাতে তারা নিজেদের খেয়ালখুশি মতো যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে।
পাকিস্তান ক্রুসেডারদের হয়ে ইমারাতে ইসলামিয়ার ওপর বোমাবর্ষণ করেছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, কাজেই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, এই দালালরা এখন ইমারতের সেই বিপুল গনীমতের (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) দিকে কুনজর দিয়েছে, যা তারা আফগানিস্তান থেকে পশ্চাদপসরণকারী আমেরিকানদের পরাজিত করে অর্জন করেছিল। ক্রুসেডারদের হয়ে এই মুনাফিক সরকার এবং তাদের আমেরিকান-দাস সেনা নেতৃত্ব জিহাদের সেই গনীমত—যানবাহন, সাঁজোয়া যান ও বিমানগুলোর ওপর বোমাবর্ষণ করেছে। তারা বহু দুর্বল ও গরীব মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ হারাম তো বটেই, উপরন্তু আল্লাহর কাছে এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। বিশেষ করে সিয়াম ও কিয়ামের মাস রমযানে এমন অপরাধের শাস্তি কল্পনাতীত। সর্বশক্তিমান ও প্রতিশোধ গ্রহণকারী আল্লাহ তাআলা বলেছেন: “আর কেউ স্বেচ্ছায় কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তাকে লানত করেছেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।” (সূরা নিসা, ০৪:৯৩)
পাকিস্তানের এই অন্যায় আগ্রাসনের মোকাবেলায় ইমারাতে ইসলামিয়াকে সর্বোচ্চ সাহায্য করার অঙ্গিকার জানিয়ে আল কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করে, আলহামদুলিল্লাহ, আমরা ‘কায়িদাতুল জিহাদ’ উম্মাহর বীর সন্তানদের সাথে এক কাতারে এখনো অটল রয়েছি। জায়নবাদী-ক্রুসেডার শত্রুরা যখন এই অঞ্চলকে নতুন করে অবরুদ্ধ করতে পুনরায় জড়ো হয়েছে, তখন আমরা ইসলামী ইমারতের ভাইদের সাহায্য করে যাচ্ছি। আল্লাহর ইচ্ছায় কায়িদাতুল জিহাদ আগ্রাসী পাকিস্তানি অপরাধী সরকার এবং তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিজেদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী ইসলামী ইমারতকে সাহায্য করে যাবে।
বিবৃতিতে পাকিস্তানের সেনা সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আল কায়েদা জানায়, পাকিস্তানি বৈমানিকদের প্রতি আমাদের আহ্বান—আপনারা আপনাদের জায়নবাদী মানসিকতা সম্পন্ন কমান্ডারদের নির্দেশ অমান্য করুন; বরং সুযোগ পেলেই তাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যা করুন। পাশাপাশি, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সম্মানবোধ সম্পন্ন সদস্যদের প্রতি আমাদের আহ্বান, আপনারা এই দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে বর্জন করুন। আমরা আপনাদের উৎসাহ দিচ্ছি, এদের উৎখাত করে জ্ঞান ও জিহাদের দেশ পাকিস্তানকে তার সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে ফিরিয়ে নিন। সেই ইতিহাস হলো নিজ দ্বীনকে সাহায্য করার ইতিহাস, উম্মাহর কেন্দ্রীয় সংকটগুলোতে পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস এবং আফগান ভাইদের সর্বোত্তম সহায়তা করার ইতিহাস। আপনারা তো সব সময়ই এই উম্মাহর মুহাজির সন্তানদের পাশে দাঁড়ানোর এক চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন এবং মহান আল্লাহর এই বাণীর বাস্তব নমুনা হয়ে ছিলেন: “মুমিনগণ তো পরস্পর ভাই ভাই।” (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১০)
কমিউনিজম এবং জায়নবাদী-ক্রুসেডার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আফগানদের কয়েক দশকব্যাপী আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে কায়িদাতুল জিহাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করে, আপনাদের সেই উজ্জ্বল ইতিহাস আমরা কখনোই ভুলতে পারি না। জায়নবাদী সরকার ও সেনাবাহিনীর দালালেরাও এর স্বচ্ছতাকে কখনোই ঘোলাটে করতে পারবে না। আমরা আশা করি, তাদের বিরুদ্ধে আপনাদের এই অভ্যুত্থানই হবে আপনাদের প্রতি আমাদের ভালোবাসার এবং উম্মাহ ও এই মহান দ্বীনের সাথে আপনাদের অটুট বন্ধনের চূড়ান্ত প্রমাণ। কমিউনিজম এবং পরবর্তীতে জায়নবাদী-ক্রুসেডার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আপনাদের এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর প্রতিরক্ষায় আপনাদের আফগান ভাইদের কয়েক দশকব্যাপী আত্মত্যাগের কথা আমরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। এই কণ্টকাকীর্ণ পথে লক্ষ লক্ষ শহীদ, আহত এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের রক্ত ও চোখের পানি বিসর্জন দিয়েছেন তারা। তারা অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করেছেন এবং এখনো করে যাচ্ছেন। সুতরাং আসুন, আমরা এবং আপনারা মিলে তাদের সেই অনুগ্রহের কিছুটা হলেও প্রতিদান দিই। সতর্ক থাকতে হবে, আমাদের কিংবা আপনাদের কারো দিক থেকেই যেন ইসলাম কোনো ক্ষতির সম্মুখীন না হয়। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার জন্য।


