বিজয়ের পদধ্বনি-১ || কাবুলের আকাশে-বাতাসে শোনা যায় তালিবানের পুনরুত্থান প্রতিধ্বনি

8
2610
বিজয়ের পদধ্বনি-১ || কাবুলের আকাশে-বাতাসে শোনা যায় তালিবানের পুনরুত্থান প্রতিধ্বনি

আর মাত্র কয়েক মাস পরেই বৈশ্বিক জিহাদী তানজিম আল-কায়েদা কর্তৃক অ্যামেরিকায় পরিচালিত ৯/১১ হামলার ২০ বছর পূর্তি হতে চলেছে। একই সাথে আফগানিস্তানে ক্রুসেডার অ্যামেরিকার আক্রমণেরও ২০ বছর পূর্ণ হবে। দীর্ঘ এই লড়াইয়ে তালিবান আর আল-কায়েদা মুজাহিদদের কৌশলী হামলায় লাঞ্চনাকর পরাজয়ের শিকার ক্রুসেডার মার্কিন ও ন্যাটা জোট। ফলে বাধ্য হয়েই আফগানিস্তান ছাড়তে হচ্ছে কথিত এই পরাশক্তিকে। মার্কিন সৈন্যদের আফগান ছেড়ে যাওয়ায় আতংক আর ভয় গ্রাস করছে কাবুল প্রশাসনের অন্তরে। মুরতাদ বাহিনীর ওপর তালিবানের হামলা বেড়েছে আগের চেয়ে আরও কয়েকগুণ বেশী। একে একে কেন্দ্রীয় ও গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোও এখন দখলে নিয়ে যাচ্ছে তালিবান।

আফগানিস্তানে তালিবানদের সাম্প্রতিক বিজয় অভিযান নিয়ে কথা বলার আগে একবার পিছনে ফেরে তাকানোও উচিৎ বলে মনে করি।

আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের লক্ষ্য ও অর্জনঃ

বিশ বছর আগে ক্রুসেডার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে অবস্থিত আরব মুজাহিদ শাইখ ওসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ-কে ৯/১১ হামলার জন্য দোষারোপ করেছিল এবং দাবি করেছিল যে আমিরুল-মু’মিনিন মোল্লা মুহাম্মদ উমার রহিমাহুল্লাহ এর নেতৃত্বাধীন ইসলামিক ইমারতের শাসন ব্যবস্থা শাইখ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ’র এই কাজের সাথে জড়িত ছিল। অ্যামেরিকা তখন শাইখ উসামাকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি করেছিল। কিন্তু প্রতিবারই অ্যামেরিকানরা মোল্লা ওমর মুজাহিদের কাছ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া নিয়েই ফিরে গেছে। কারণ মোল্লা ওমর কোন মুসলিম ভাইকে কাফেরের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য কোনক্রমেই প্রস্তুত ছিলেন না। বিপরীতে তিনি মার্কিন পক্ষকে তাদের দাবির পক্ষে মজবুত কোন প্রমাণ সরবরাহ এবং তা ইসলিমক ইমারতকে দেখানোর জন্য বলে আসছিলেন। কিন্তু শাইখ ওসামা ও তারা সাথীরা হামলাটি এতটাই নিপুণতার সাথে পরিচালনা করেছিলেন যে, ক্রুসেডার অ্যামেরিকা এটা প্রমাণ করতে ব্যার্থ হয়েছে যে, শাইখ ওসামা রহ. ও তাঁর সাথীরা এই বরকতময় হামলাটি চালিয়েছেন বা তিনি এর মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন। ফলে মোল্লা ওমর রহিমাহুল্লাহ তাঁর অবস্থানে দৃঢ় ছিলেন।

এর প্রেক্ষিতে অহংকারে অন্ধ অ্যামেরিকা স্বাধীন দেশ আফগানিস্তানে আক্রমন করে বসে। অ্যামেরিকা হয়তো নিজের অহংকারের কারণে তখন ভুলেই গিয়েছিল যে, এটা সাম্রাজ্যবাদীদদের কবরস্থান। এখন বিশ বছর পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই এই প্রশ্ন উঠেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা মোল্লা ওমর এবং তার অনুসারীদেরকে আরও শক্তিশালী করেছে, তাদের কাছে আগে যা ছিলনা এখন তারা সেটাও অর্জন করে নিয়েছেন।

কেউ যদি বলেন যে সন্ত্রাসবাদ শেষ করার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়েছিল, তবে অ্যামেরিকার চোখে সন্ত্রাসী ছিল শাইখ ওসামা, আরব মুজাহিদিন এবং তালিবান। দশ বছর আগে শাইখ ওসামা শহীদ [ইনশা আল্লাহ] হয়েছেন। কিন্তু তাঁর গড়ে তোলা মুজাহিদ বাহিনীটি কি শেষ হয়ে গেছে? বা বিশ্বব্যাপী তাদের বিজয় অভিযান কি থেমে গেছে? তারা কি তালিবানদের প্রতিপত্তি শেষ করতে পেরেছে? নিশ্চই এখন উত্তর আসবে না। তবে এ কথা সত্য যে, প্রথমদিকে অ্যামেরিকা ও তার মুরতাদ দোসর পাকিস্তান মিলে বেশ মুজাহিদকে শহীদ করে দিতে সমর্থ হয়েছিলো এবং সাময়িক ভাবে তারা মুজাহিদদের পিছু সরে যেতে বাধ্য করতে সমর্থ হয়েছিল।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে মাত্র ২০ বছর আগে সন্ত্রাসী তকমা দেয়া তালিবানের সাথেই কথিত গনতন্ত্রের ধারক অ্যামেরিকা আজ চুক্তি করতে বসেছে! তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে ২০ বছর আগে কি তাদের বাধা দিয়েছিলো আলোচনার টেবিলে বসতে? তাদের উন্মত্ত অহংকার আর তাদের আখ্যা দেয়া সন্ত্রাসবাদ বা টেরোরিজম স্বার্থপর একটি প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই না! তারা এটিকে তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এবং নিজেদের জঘন্য হত্যাকান্ড আড়াল করার জন্য ব্যাবহার করে। আজ প্রমানিত যে, সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী আসলে অ্যামেরিকা নিজেই!

অ্যামেরিকার আরেকটি কথিত এজেন্ডা ছিলো আফগানিস্তানে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। নারীদের আধুনিকায়ন করা। অথচ এটি প্রমানিত তারা নারীর অধিকার বলতে সর্বোচ্চ বুঝে থাকে, পোশাক সংক্ষিপ্ত করতে থাকা, বেহায়াপনা এবং অশ্লিলতার প্রচার এবং প্রসার ঘটানো। যে অ্যামেরিকা নারীদের কাজের অধিকারের কথা বলে, সেই অ্যামেরিকা ২০ বছরে আফগানিস্তানের ভউত অবকাঠামো উন্নয়নে তেমন কোন কাজই করেনি। ইন্ডিপেন্ডেন্ট রিভিউ কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ বছরে শুধু মার্কিন সামরিক বাহিনীতেই কর্মরত প্রায় ৫ লক্ষ ৯ হাজার সৈন্য যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছে। চিন্তা করুন তাদের সামরিক বাহিনীতেই যদি এই অবস্থা হয়ে থাকে, তাহলে যেসব দেশে তারা আগ্রাসন চালিয়েছে সেখানে তারা কত নারীর সম্ভ্রমহানি করেছে। সারকথা এই যে, অ্যামেরিকার মুখে নারী অধিকার আর শেয়ালের কাছে মুরগি রাখা একই কথা! তারা তো এমন নির্লজ্জ এক জাতি যারা নিজেদের কাজের সাথীকেও ধর্ষণ করতে দ্বিধা করেনা! এমনকি নিজেদের বন্ধুদের স্ত্রীরাও তাদের কাছে নিরাপদ নয়। এরাই কিনা আমাদের নারী অধিকারের সবক দেয়!

অ্যামেরিকার লক্ষ্য যদি সত্যিই তাদের ভাষায় সন্ত্রাসবাদ নির্মূল ও নারীর অধিকার রক্ষা করা হয়ে থাকে, তবে এতে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে (বরং তারাই এসব অপরাধের সাথে সবাচাইতে বেশি জড়িত)। আর যদি তা না হয়, তবে প্রশ্ন আসে তারা কেন আফগানে এলো এবং কেন তারা এদেশে এত লোককে শহীদ করেছিল?

উপরের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটিও অ্যামেরিকার লক্ষ্য ছিলনা, বরং এগুলো হচ্ছে সাধারন মানুষকে ধোঁকায় ফেলে রাখার একটি মন্ত্র মাত্র। তবে অ্যামেরিকার জন্য মাথা ব্যথা ছিল তৎকালীন ইসলামী ব্যবস্থা, আর তখন অ্যামেরিকার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী চিন্তাভাবনা, ইসলামের পুণরুত্থান ও নব শক্তিকে দমিয়ে দেওয়া। কিন্তু তারা এই লক্ষ্যেও ব্যার্থ হয়েছে। কেননা এখন এক আফগানিস্তানের স্থলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুজাহিদগণ বহু অফগানিস্তান আর ইসলামিক ইমারাত প্রতিষ্ঠা করে চলছেন।

তালিবান ও আল-কায়েদার অন্য একটি লক্ষ্য ছিল আমেরিকা সম্পর্কে অপরাজেয় যে ধারণা মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল তা চুর্ণ করে দিয়ে বিশ্বের দরবারে সেই সন্দেহ দূর করা। বরতমানে তালিবানরা বিশ্বের সাথে একটি রাজনৈতিক সম্পর্কও তৈরি করে চলছেন। আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে সাধারন জনগণও এখন মুজাহিদদের সমর্থন ও সহায়তা করে যাচ্ছেন, তারা মুজাহিদদের বিজয়ে আনন্দ প্রকাশ করছেন। শরিয়াহ্ শাসন ফিরিয়ে আনতে তারা ত্বাগুত সরকারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। নিশ্চই এটি মুজাহিদদের জন্য বিশাল এক বিজয়। আলহামদুলিল্লাহ্।

সংক্ষেপে এই যুদ্ধে কুফ্ফার জোটের প্রধান লক্ষ্য ছিল কয়েক দশক ধরে নিজের হাতে তৈরি করা কুফরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা। কেননা সে সময়ে এই কুফরি ব্যবস্থার বিপরীতে ফিরে আসতে শুরু করেছিল ইসলামী শাসন ব্যাবস্থা, ৯০ দশকের শেষভাগে যার সূচনা করেছিলেন তালিবান মুজাহিদগণ। যার ফলে কুফ্ফার বিশ্বের প্রয়োজন ছিল যেকোনও মূল্যে এই ব্যাবস্থাকে উৎখাত করা। সেই লক্ষ্যে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায় সম্মিলিত কুফ্ফার জোট বাহিনী। কিন্তু অ্যামেরিকার এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী ইসলামিক এই ব্যাবস্থা আরও প্রসারিত হয়েছে মহান রবের সাহয্য আর আপন আধিপত্য ও শক্তি নিয়ে। বিপরীতে, গণতন্ত্র নামক কুফরি শাসন ব্যাবস্থা বিশ্বে ঘৃণিত ও লাঞ্ছিত হয়ে পড়েছে। এটি একটি অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে। এর জাতিরা তাদের শাসকদের প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছে। ইসলামপন্থী গণতান্ত্রিক দলগুলোও মানুষকে নিরাশ করেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই দলগুলো কুফরি গণতন্ত্রের মাধ্যমে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও ইসলামি হুকুম কায়েম করে জ্বলন্ত প্রমান মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিম।

আজকের ইসলামপন্থী গণতান্ত্রিক দলগুলোর আদর্শ ও পথ পদর্শক বা তারা যাদের মানহাযের উপর এই গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলামিক হুকুমত কায়েমের দিবাস্বপ্ন দেখে সেটি হচ্ছে মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমিন (ব্রাদারহুড)। হাসানুল বান্নার নেতৃত্বে ১৯২৮ সালে মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিনের যাত্রা শুরু করে। এরপর মিসরে সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে বেশি জনসমর্থন নিয়ে দীর্ঘ ৮৪ বছর পর অর্থাৎ ২০১২ সালে প্রথমবারের মত সংগঠনটির কোনো নেতা মিসরের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন ইসলামিক গণতন্ত্রপন্থী এই দলটিও পারেনি এত বিপুল জনবল ও শক্তি নিয়েও ইসলামি হুকুমত বাস্তবায়ন করতে। বরং এক বছর যেতে না যেতেই সামরিক হস্তক্ষেপে ক্ষমতাচ্যুত হয় দলটির পক্ষহতে মিসরের ক্ষমতায় যাওয়া প্রেসিডেন্ট মুরসি।

বিপরীতে মোল্লা মোহাম্মদ ওমর মুজাহিদের (রহিমাহুল্লাহ) নেতৃত্ব ১৯৯৪ সালে মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়ে শুরু হওয়া তালিবান আন্দোলন আল্লাহ্ প্রদত্ত দ্বীন কায়েমের সঠিক পথ জিহাদের মাধ্যমে মাত্র ২ বছরের মাথায় ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল বিজয় করেন। এরপর ২০০১ সালের ৭ অক্টোবরের আগ পর্যন্ত আফগানিস্তানে ইসলামিক হুকুমত কায়েম রাখেন। অতঃপর মার্কিন আগ্রাসনের ফলে সাময়িক সময়ের জন্য তালিবানরা ক্ষমতাচ্যুত হলেও আবারো কাবুলের আকাশে শুনা যাচ্ছে তালিবানদের বিজয়ের প্রতিধ্বনি। অনুরূপ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই মুজাহিদগণ জিহাদের এই আওয়াজ আজ বুলন্দ করছেন, মালি ও সোমালিয়া সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তাঁরা ইসলামিক শরিয়াহ্ ভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। আলহামদুলিল্লাহ্

যুবকরা আজ কুফরি গণতন্ত্রের মোহ থেকে বেরিয়ে জিহাদের দিকে ফিরে আসছে, ফলে মুসলিম যুবকরা আজ দেশে দেশে জিহাদ ও খিলাফাহ্’র আওয়াজ তুলছে, জিহাদের বরকতময় কাফেলায় শরিক হচ্ছে। যেই আওয়াজের প্রতিধ্বনি শুনা যাচ্ছে- শাম, ইয়ামান, পাকিস্তান, সোমালিয়া, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, নাইজার, মালি, বুর্কিনা-ফাসো, আইভরি-কোস্ট ও আল-জাজায়ের সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে। যার ছোয়া থেকে বাদ পড়ছে না বাংলাদেশ সহ উপমহাদেশের অন্যান্য দেশগুলোও।

ইমামুল মুজাহিদিন শহিদ শাইখ উসামা বিন মুহাম্মাদ রহিমাহুল্লাহ বলেন- যে বা যারাই প্রতিরোধ ও প্রস্তুতি ব্যাতীত অন্য কোনো মাধ্যমে ইসলামের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের কথা বলেন তারা মুজাহিদিনের অবমাননা তো করেনই, একই সাথে উম্মাহকে অবাস্তব কল্পনার চোরাবালিতে আটকে ফেলেন।

চলবে ইনশাআল্লাহ্…


লেখক: ত্বহা আলী আদনান, প্রতিবেদক: আল ফিরদাউস নিউজ।

8 মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন