কাবুলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা: আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে তালিবানদের কিছু দূরদর্শিতা

3
2225
কাবুলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা: আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে তালিবানদের কিছু দূরদর্শিতা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা’য়ালার। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর।
কোন সন্দেহ নেই, একজন ব্যক্তি যেমন বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে অভিজ্ঞতা অর্জন করে ঠিক তেমনি একটি সংগঠনও বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে অভিজ্ঞতায় পরিপক্বতা অর্জন করে। সাধারণভাবে সংগঠনগুলো প্রাথমিকভাবে উঠতি বয়সী যুবকের মতো কঠোরতা প্রদর্শন করে। তাদের মাঝে নমনীয়তা ও কোমলতা থাকে না। কিন্তু দীর্ঘ দিন মাঠে ময়দানে কাজ করার পর এক পর্যায়ে বেশ অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং তাদের অভিজ্ঞতা এক পর্যায়ে অন্য সকল সংগঠনের অভিজ্ঞতা থেকে অগ্রগামিতা লাভ করে। কেননা এতে সকল সদস্যের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হয় যা সংগঠনের একটি সামষ্টিক অভিজ্ঞতার রূপ ধারণ করে। নিশ্চয় তালেবানরা অভিজ্ঞতার অঙ্গনে একেবারে নতুন নয়।

ইসলামী আন্দোলনে অভিজ্ঞ এবং এ বিষয়ে খোঁজ খরব রাখেন এমন ব্যক্তির কাছে এই ইতিহাসটি নতুন নয় যে, আমিরুল মু’মিনীন মোল্লা মুহাম্মদ ওমর রহ. এর নেতৃত্বে তালেবান আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলো। তারপর ১৯৯৬ সালে কাবুল দখল করে এবং প্রায় পাঁচ বছর ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এরপর বর্বর আমেরিকা ২০০১ সালে এক লড়াইয়ের মাধ্যমে তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করে। তখনকার সময়ে তালিবানরা কাফির দুশমনদের সাথে কোন ধরণের রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনার সুযোগ পায়নি। কেননা তা ছিলো তাদের আন্দোলনের সূচনালগ্ন। ফলে তারা এক তরফা কিছু বিষয় গ্রহণ করেছিলো, যেমন নারীদের অধিকার ও তাদের কাজেকর্মে যোগ দেয়া, সমাজে তাদের চলাফেরা ও পোশাকের ক্ষেত্রে তারা শুধুমাত্র হানাফিদের ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিলো, যা পশ্চিমাদের কাছে বাড়াবাড়ি এবং সন্ত্রাসী বলে মনে হয়েছে। ফলে তালেবান শত্রুদের পাশাপাশি ভিন্ন মাজহাব ও ভিন্ন মতামত লালনকারী অনেক মুসলিমদের কাছ থেকেও দূরে সরে গিয়েছিলো। বিশেষ করে ঐ সকল মুসলমান যারা সামরিক ও অর্থনৈতিকসহ সর্বত্র পশ্চিমাদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলো।

কিন্তু সময় এবং অভিজ্ঞতা তালিবানদের কাজের মাঝে বেশ পরিবর্তন সাধন করেছে; ফলে তারা পৃথিবীতে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে যেসব উন্নতি ও কাঠামোর অগ্রগতি হয়েছে আশা করা যায় যে, তারা খুব শীঘ্রই তা মাঠ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করে দেখাতে পারবে। কিন্তু ভবিষ্যতে কী ধরণের উন্নতি- অগ্রগতি অর্জন হবে তা গবেষণার বিষয়।
আমরা কথা বলবো বর্তমানকে সামনে রেখে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবো। প্রথমেই আমরা কোন বিষয়ে অহেতুক মন্তব্য করবো না। বরং যারা কাজ করছে উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তাদের সাহায্য সহায়তা করবো। আমরা আজ তালিবান কর্তৃক যে পরিভাষাগুলোর ব্যবহার দেখতে পাচ্ছি তার বাস্তবতা এখনো আমাদের সামনে প্রতিফলিত হয়নি। যেমন চিন্তা ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমে স্বাধীনতা এবং বিশ্বের সকল দেশের সাথে ভাল সম্পর্ক রাখার আকাঙ্ক্ষা, (জায়নিস্ট ইয়াহুদী বাদে) এবং কোন বিধি-নিষেধ ছাড়া ব্যাপকভাবে মহিলাদের কাজের স্বীকৃতি; এগুলো সব এমন বিষয় যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিজেদের মতো করে প্রচার করে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করছে।

অথচ আমরা তালেবানের মুখপাত্র থেকে সুস্পষ্টভাবে কয়েকটি সিদ্ধান্ত শুনেছি যা পরিবর্তন যোগ্য নয় এবং তা নতুন করে আলোচনারও অপেক্ষা রাখে না। কারণ যে নতুন রাষ্ট্র তালেবানের শাসনের অধীনে এসেছে, সেটি একটি ইসলামী রাষ্ট্র এবং ইসলামী শরীয়াহর বিধান পালনের অঙ্গীকারাবদ্ধ। তালিবান শরীয়াতের বিষয়গুলোতে এবং এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে কাউকেই কোন ধরণের হস্তক্ষেপ করতে দিবে না। এটি ছিলো তাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য। যা নীতিবান কোন লেখক ও পর্যবেক্ষক উপেক্ষা করতে পারে না। এ ছাড়াও তাদের অন্যান্য বিবৃতিগুলোকে এই মৌলিক কথাগুলোর উপর ভিত্তি করে ব্যাখ্যা করতে হবে। এটিই তাদের মৌলিক বক্তব্য। আর অন্যান্য সব হলো এর আংশিক ব্যাখ্যা বিবৃতি।

নারী অধিকারের প্রতি ইসলাম শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু এই শ্রদ্ধা পশ্চিমা নারীবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। তালেবান ঘোষণা দিয়েছে, শুধু নারী শিক্ষা নয় বরং নারীদের পাঠদানের অধিকারেরও দায়িত্ব নেবে। তবে শর্ত দিয়েছে সহশিক্ষা বন্ধ থাকবে এবং বোরকা পরা বাধ্যতামূলক আর এটাই শরীয়াহ। আমরা তালিবানের ফিকহি মাসআলাগত দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি পরিবর্তন লক্ষ করেছি যে, পূর্বের মতো তারা নারীদের জন্য নেকাব বাধ্য করেনি। বরং তালিবানেরে এক সরকারী মুখপাত্র চেহারা অনাবৃত তবে বোরকা পরিহিতা এক মহিলা সাংবাদিকের মুখোমুখি হয়ে কথা বলেছেন। এটি তাদের বর্তমান ফিকহি মাসআলায় উদারতার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমি নিকাবের দলিলগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। হিজাবের বিষয়টি যদি শরয়ী দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়; তাহলে বর্তমান পৃথিবীতে এর বৈধতাকে আমি গুরুতর সমস্যা মনে করছি না।

একইভাবে পাশ্চাত্যের সাথে আচরণ এবং প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণের মূলনীতিগুলো শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক না, সুন্নাহর সাথেও না। কারণ মুসলিম জাতিসত্তাকে টিকেয়ে রাখার জন্য প্রতিবেশী দেশের সাথে যেসব চুক্তি করা হয়েছে তা ব্যাপকার্থে নয়। বরং এতে শর্ত রয়েছে যে, তারা মুসলিমদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে কোন ধরণের অন্যায় হস্তক্ষেপ করবে না এবং আদর্শগত যুদ্ধেরও চেষ্টা করবে না। পাশাপাশি যাদের সাথে চুক্তি করা হয়েছে তাদের কুফরির কারণে তাদের সাথে কোন ধরণেন মিত্রতা ও বন্ধুত্ব থাকবে না। ফলে তাদের সাথে লেনদেন করতে কোন অসুবিধা নেই।

কেননা ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থা তার দুর্বল এবং সবল উভয় সময়ে কাফিদের সাথে এ ধরণের চুক্তি করেছে ইতিহাসে এমন প্রমাণ রয়েছে। তবে ইবনে যায়েদ, ইবনে সালমান, সিসিসহ অন্যান্য তাগুতরা যারা শরীয়তকে অবহেলা ও অবজ্ঞা করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং কাফেরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে মুসলিমদের হত্যা করছে এবং ইসলামের বিভিন্ন বিধানের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করে আসছে, তাদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে তাওহীদের মজবুত হাতল ভেঙ্গে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে সাধারণ মুসলিমগণ কুফরের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। আপনি সর্বদা তাদেরকে কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করতে, মুসলমানদের হত্যা করতে এবং শরয়ী বিষয়গুলোকে নিয়ে তাচ্ছিল্য করতে দেখেবেন। ঠিক তেমনিভাবে তথাকথিত শান্তিবাদী এবং পশ্চিমাদের কাছে আত্মসমর্পণকারী সংগঠনগুলো আল্লাহর চেয়ে পশ্চিমাদেরকে বেশি ভয় পায়। এমনকি পশ্চিমা বিশ্বের সাথে কুফরি বন্ধুত্বের এজেন্ডা বাস্তবায়নে আল্লাহর কালামকে বিকৃত করা, শরীয়াহর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার মত জঘন্য কাজগুলোও তারা করে চলেছে। অনুরূপভাবে সিসি ও ইবনে যায়েদের মতো কিছু লোককে জায়নিষ্ট ইহুদির চালচলনে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে দেখবে। জাওলানির সংগঠনের মতো অনেকেই প্রতারক এবং সেকুলারদের ভাড়াটে তুর্কিদের প্রতারণার শিকার দায়িত্বহীনদের পতাকাতলে আশ্রয় নিয়েছে।

কাজেই এখন পর্যন্ত তালিবানরা যা ঘোষণা দিয়েছে সেগুলোকে এদের হীন কার্যকলাপের সাথে তুলনা করা যাবে না। যেমনটি আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ভবিষ্যতের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের বিষয়। দিন যতো অতিবাহিত হবে ততই নতুন নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি হবে। যার উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতের কর্মসূচী ও অগ্রসর হওয়ার পথ সুগম হবে।

তাই সচেতন মুসলিমদের লক্ষ করে বলছি; পরাজিত মানসিকতা সম্পন্ন শরীফ ও আশরাফ ইব্রাহীমের মতো অনির্ভরযোগ্য ইউটিউব সেলিব্রেটিদের কথায় কান দিবেন না। কারণ না আছে তাদের শরীয়তের জ্ঞান! আর না আছে এর মূলনীতি বিষয়ক কোন সুস্পষ্ট ধারণা। তাই তো অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের সমাধান ও বিশ্লেষণকে সামনে রেখে কোন শরয়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না। ঠিক তদ্রূপ তাদের মধ্য হতে বিশেষভাবে যারা কোন ইসলামী সংগঠনের ধারক বাহক বা অন্য কোন ইসলামী দলের সমর্থক তারা সমালোচনার ক্ষেত্রে চর্বিতে বিষ মিশিয়ে দেয়, এবং হিতাকাঙ্খির ছদ্মবেশে দ্বীনে ইসলাম ও মুসলিমদের সমালোচনা করে বেড়ায়। এটি ভণ্ডামি বৈ কিছু নয়।
তদুপরি আমরা আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রগুলোর সাথে অর্থনৈতিক সহযোগিতার চুক্তির দিকে তাকালে দেখতে পাবো যে, ইসলামের উল্লেখযোগ্য শর্তগুলোর প্রতি পূর্ণ বিবেচনা রেখে কাফিরদের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলাতে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে কোন সমস্যা নেই। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবে-তাবেঈন রাজি. সহ সকল যুগেই কাফিরদের সাথে মুসলিমদের নানা বাণিজ্যিক চুক্তি ছিলো। এখানে একটি প্রশ্ন উঠছে যে, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বয়কটের সম্মুখে দাঁড়ানো বরং বিশ্ব ব্যাংকের সাথে লেনদেন করা না করার বিষয়ে তালিবান কী ধরণের পদক্ষেপ নিবে? বর্তমানে বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট নয়।

কিন্তু বিশ্ব ব্যাংকের লেনদেন সুদ নির্ভর হওয়াতে ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে, যে কোন পরিস্থিতিই এই লেনদেন সম্পূর্ণ হারাম বরং স্বনির্ভরতার পথে বাঁধা। ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়া, সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোসহ নানা ক্ষতির দিকে তাকিয়ে এই সুদ ভিত্তিক লেনদেন কোনভাবেই সঠিক হবে না। আমার ধারণা, আফগান তালিবানরা যদি বিশ্বব্যাংকের সাথে লেনদেন না করে তা হলে এতে তাদের অর্থনৈতিক কোন সমস্যায় পড়তে হবে না। কারণ আফগানিস্তানে পর্যাপ্ত পরিমাণ খনিজ সম্পদ ও জলীয় পদার্থ রয়েছে। তাছাড়া পরস্পর শরীয়ত সম্মত ও বিভিন্ন লেনদেনের ও চুক্তিরও প্রচলন রয়েছে। আর তাতেই আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক চাহিদার যোগান দেয়া সম্ভব হবে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনার দাবি রাখে। তা হলো তালিবানের বিভিন্ন ঘোষণায় এই বিষয়টি বারবার ফুটে উঠেছে যে, আফগান ভূমিকে ব্যবহার করে কাউকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের কোন রাষ্ট্রে হামলা করার সুযোগ দেয়া হবে না। মৌলিকভাবে এর দ্বারা উদ্দেশ্যে হচ্ছে আল-কায়েদা। দাওলা নয়, কেননা দাওলা তো তালিবান এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের পুরাতন শত্রু । তারা পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্য পাচ্ছে। সুতরাং তালিবানের এই বক্তব্যের মূল ফোকাস দাওলা নয়।
তবে এখানে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ আছে;

১. আল কায়েদার কোন নেতা বা সদস্যকে শত্রুদের নিকট হস্তান্তরের বিষয়ে তালিবানরা এখনো কোন স্পষ্ট বার্তা দেয় নি। চাই তারা বর্তমানে আফগানের মাটিতে অবস্থানরত হোক বা পরবর্তীতে আগমন করুক।
২.পশ্চিমে হামলার জন্য আফগান ভূমিকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। এর অর্থ এই নয় যে, আফগানের বাহিরে আরব উপদ্বীপে বা পশ্চিমে মরক্কোতে বা আফগানের সীমান্ত ঘেঁষা কোন রাষ্ট্রে জিহাদী কার্যক্রমকারীদের আফগানে বসবাস করতে দেয়া হবে না। যেমনটি আল কায়েদাসহ অন্যারা…। তবে আমি মনে করি যে বর্তমান পরিস্থিতি তালেবানরা তাদের এলাকায় এ ধরণের উচ্চ পর্যায়ের হামলার অনুমতি দেবে না।
৩. আফগান অঞ্চল থেকে হামলা চালানো হলে এমন প্রতিক্রিয়া হতে পারে যা আফগানের নতুন অবকাঠামোকে ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। ফিকহের অনুসরণ এবং সার্বিক কল্যাণের বিবেচনা করে তালিবানরা আফগান অঞ্চল থেকে এমন কোন হামলার অনুমতি প্রদান করবে না; এই অবস্থান আল ওয়াল বারা এর মূলনীতির বিপরীত নয়।
৪. ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের ভাড়াটিয়া গোলাম জাওলানীর সংগঠনের হামলার ফলে সিরিয়ায়, বিশেষ করে ইদলিবে যে দুর্ঘটনা ঘটেছে, এসব কর্মকাণ্ডের সাথে তালিবানের মূলনীতির কোন সম্পর্ক নেই। বিশেষ করে জাওলানীর সংগঠনের লোকেরা আহলে ‍সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ঐসব ভাইদের গ্রেফতার করেছিলো; যারা তুর্কিদের বাদ দিয়ে নুসাইরি ও রুশদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে চেয়েছিলো।
যার ফলে সেখানে নিম্নোক্ত পরিস্থিতিগুলো তৈরি হয়েছে;
(ক) সিরিয়া দেশটি রাশিয়া ও নূসাইরিদের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে, পাশাপাশি সেখানে যুদ্ধ অবস্থা ক্ষান্ত হয়নি বরং পরিস্থিতি ক্রমশ জটিলতার দিকে এগিয়ে গেছে।
(খ) সিরিয়াকে ঘিরে আন্তর্জাতিকভাবে সমঝোতা এতটাই সুস্পষ্ট যে, রাশিয়া ও নূসাইরিরা মুসলিমদের হত্যা করার ‍অনুমোদন পেয়েছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কমিশন তাদের সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে এবং মুজাহিদদের আত্মরক্ষামূলক লড়াইয়েও বাঁধা প্রদান করছে, কিন্তু তালিবানদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তুর্কিদের সাথে সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে ‘তারা আমাদের মুসলিম ভাই’ এই মর্মে। তারা একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র এবং সেক্যুলার রাষ্ট্রের সাথে লেনদেন, চুক্তি করার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়। আর তালেবান পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে চুক্তি ও লেনদেন করেছে। আর মুসলিমদের সাথে চুক্তি এবং পশ্চিমাদের সাথে চুক্তির মাঝে বিস্তর ফারাক রয়েছে।
(গ) সিরিয়ায় জাওলানীর অবস্থা ও আফগানের তালিবান উভয়ের শক্তি ও সমকক্ষতার দিকে তাকালে এটি সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, উভয় দলের মাঝে বিরাট ব্যবধান রয়েছে। যখন তালিবানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং পাহাড়সম দাপট ছিলো না তখন তারা পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো থেকে কোন সহায়তা গ্রহণ করেনি। তবে তারা সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেছে, যেমন পূর্বের প্রবন্ধে তা সুস্পষ্ট আলোচনা করেছি। অপরদিকে জাওলানীর সংগঠন যা শক্তি সামর্থ্যের দিক থেকে রিক্ত হস্ত, এবং শত্রুর মোকাবেলায় অনেক দুর্বল ছিলো, এমতাবস্থায় তারা শত্রুর সাথে সমঝোতা করতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে অস্ত্র ও জিহাদ ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে।
৫. শরঈভাবে সরকার ব্যবস্থা গঠন হলে সেখানে যে কোন বিচার কার্যক্রমই দ্রুত নিষ্পত্তি করা সহজ হয়।
সম্প্রতি ধর্মনিরপেক্ষ গণমাধ্যমগুলো, বিশেষ করে তুর্কি গণমাধ্যমে যে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে তার বাস্তব অবস্থা নিম্নরূপ। এক ব্যক্তি ভেড়া চুরি করেছে এবং নিজ অপরাধ স্বীকার করায় তাকে দ্রুত বিচারের আওতায় এনে খুব সহজেই বিচার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তার অপরাধের সত্যতা প্রমাণিত করে তা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তারপর বিষয়টি একজন ইসলামী ফকিহ কাজির উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যিনি বিষয়টির সব দিক বিবেচনা করে শরীয়াতের আলোকে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছবেন।
কিন্তু নিকৃষ্ট গণমাধ্যমগুলো বিষয়টা এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যার প্রতিবাদ করারও ভাষা নেই। এরা জানে না যে শরয়ী কাজির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন রিভিউ নেই। এবং ধর্মনিরপেক্ষবাদের বিচার কার্যক্রমের মতো এখানে কোন উকিল পেশাও নেই। অপরদিকে পশ্চিমারা বিচার ব্যবস্থার এমন দীর্ঘসূত্রিতা আবিষ্কার করেছে; যাতে আইনের ফাঁক ফোকরে অপরাধকে অনেক সহজ করে তোলা হয়। এক পর্যায়ে অপরাধী তার অপরাধের শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি পায়। এবং এই হাস্যকর পদ্ধতির জন্য অনর্থক অনেক সম্পদ ব্যয় হয়।
এতে কোন সন্দেহ নেই; তালিবানদের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি এবং শরয়ী বিষয়গুলোর প্রয়োগ খুব শীঘ্রই আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে; যা বর্তমানে আমাদের জানা নেই। সুতরাং আমরা আশাবাদী যে, তালিবানরা ইসলামের প্রথম যুগের নীতিমালাকে কঠোরভাবে আঁকড়ে ধরবে। যা তারা বারবার স্পষ্ট করে বলেছে। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে আমরা এর সাক্ষী হবো।

ড. তারেক আব্দুল হালিম

১২ মুহররম ১৪৪৩ হিজরি
২০ আগস্ট ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

3 মন্তব্যসমূহ

  1. “”””””””ইসলামী আন্দোলনে অভিজ্ঞ এবং এ বিষয়ে খোঁজ খরব রাখেন এমন ব্যক্তির কাছে এই ইতিহাসটি নতুন নয় যে, আমিরুল মু’মিনীন মোল্লা মুহাম্মদ ওমর রহ. এর নেতৃত্বে তালেবান আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলো।””””””””””””””””

    মুহতারাম ভাই আমার জানামতে এই ইনফোরমেশনটি ভূল। যদি ভূল হয়ে থাকে তাহলে চ্যাক করার অনুরোধ থাকলো।

    • না ভুল নয়। ভাই, আপনি বুঝতে ভুল করে থাকতে পারেন। যখন মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে তালিবান গর্জে উঠে, তখনই প্রথম তারা জিহাদের ময়দানে আসনেনি, বরং আগে রাশিয়ার বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন। অত:পর যখন দলগুলো নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত হলো, তখন নিজেদের মাদরাসায় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তারপর যখন পরিস্থিতির অনেক অবনতি হয়, তখন সেই ধর্ষণের ঘটনাটি উপলক্ষে জেগে উঠে। ভাই, না জেনে এতে সহজে একজন বিজ্ঞ লেখকের ভুল ধরে ফেলবেন না।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন