বিজয়ের মাস; মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ।।পর্ব-৭।। ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়; আরব উপদ্বীপে পৌত্তলিকদের নাপাক আধিপত্যের অবসান।(শেষ কিস্তি)

0
1314
বিজয়ের মাস; মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ।।পর্ব-৭।। ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়; আরব উপদ্বীপে পৌত্তলিকদের নাপাক আধিপত্যের অবসান।(শেষ কিস্তি)

রাসূলের ﷺ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত হলো, একদল কুরাইশ সেনা-

অষ্টম হিজরীর ১৭-এ রমাদান, মঙ্গলবার। মাররুয যাহরান নামক স্থান থেকে ছাউনি তুলে মক্কার দিকে অগ্রসর হচ্ছে দশ হাজার মুসলিম বাহিনী। আবু সুফইয়ান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন মুসলিম বাহিনীর শানশওকত। তাঁর এখন আর বুঝতে বাকি নাই যে, এত বিশাল ও শক্তিশালী বাহিনীর মোকাবিলা করার সামর্থ মক্কাবাসীর নাই। আনসারদের পতাকা ছিল হযরত সা’দ বিন উবাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাতে। তিনি যখন আবু সুফইয়ানের পাশ কেটে যাচ্ছিলেন তখন তাঁকে লক্ষ করে বললেন, “আজ যুদ্ধ ও রক্তপাতের দিন, আজ হারাম শরীফকে রক্তপাতের জন্য হালাল করা হবে।”

অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ আবু সুফইয়ানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আবু সুফইয়ান রাসূলকে ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, সা’দ কী বলেছে তা কি আপনি শুনেছেন? তিনি বললেন: না, আমি তো শুনিনি! সা’দ রাদিয়াল্লাহু আনহু কী বলেছেন তা আবু সুফইয়ানের থেকে শোনার পর রাসূল ﷺ বললেন, না তা হবে না! বরং আজকের দিনে কা’বার যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শিত হবে। আজকের দিনে আল্লাহ তা’আলা কুরাইশদের সম্মানিত করবেন।”

এরপর তিনি হযরত সা’দ বিন উবাদা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাত থেকে পতাকা নিয়ে তাঁর পুত্র হযরত কায়িস রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাতে সোপর্দ করার নির্দেশ দেন। এতে তিনি সা’দ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে শাস্তিও যেমন দিলেন, পতাকা তাঁর ছেলের হাতে সোপর্দ করে পক্ষান্তরে তাঁকে সম্মানিতও করলেন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে এরকমই ছিল রাসূলের ﷺ ইনসাফ ও হিকমাহপূর্ণ বিচার।

এরপর আবু সুফইয়ান দ্রুতগতিতে মক্কায় গিয়ে রাসূলের ﷺ আগমনী বার্তা পৌঁছে দিলে এবং সবাই নিজ নিজ ঘরে নিরাপদ-রাসূলের ﷺ এই ঘোষণাও শুনিয়ে দিলে সবাই নিজ নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করতেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে।

কিন্তু ইকরিমাহ বিন আবু জাহল, সফওয়ান বিন উমাইয়া ও সুহাইল বিন আমরের নেতৃত্বে তাদের মতই কিছু কট্টর মুসলিম বিরোধী  কুরাইশ সেনা মক্কার পূর্ব-পশ্চিমে খান্দামা নামক স্থানে একত্রিত হয় রাসূলের ﷺ মোকাবিলা করার জন্য। এটি ছিল মক্কার নিম্নাঞ্চল। কিন্তু তাদের এই অপতৎপরতার সংবাদ রাসূলুল্লাহর ﷺ কাছে গোপন ছিল না। তিনি জানতে পারেন যে, মক্কার নিম্নস্থানে কুরাইশ সেনারা একত্রিত হচ্ছে।

মুসলিম বাহিনীর বিন্যাস,স্বল্পকালীন খণ্ডযুদ্ধ ও মক্কায় প্রবেশ-

এদিকে মুসলিম বাহিনী যূ-তুওয়া নামক স্থানে এসে পৌঁছলেন। বিচক্ষণ সেনাপতি মুহাম্মাদ ﷺ মুসলিম বাহিনীকে মোট চার ভাগে বিভক্ত করলেন এবং চার ভাগকে চার দিক থেকে মক্কায় প্রবেশ করার নির্দেশ দিলেন। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, মক্কার নিম্নাঞ্চল খান্দামা দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে। যেহেতু সেখানে কুরাইশদের একটা দল যুদ্ধের জন্য একত্রিত হয়েছে তাই তাঁকে এই নির্দেশনাও দিয়ে দিলেন যে, আগ বাড়িয়ে যুদ্ধ শুরু করবে না। তবে কুরাইশরা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তাদের কাউকে ছেড়ে দিবে না; ফসলের মত কেটে শেষ করে দিবে। এরপর সাফা পাহাড়ে আমার সাথে মিলিত হবে।

দ্বিতীয় ভাগের নেতৃত্বে থাকেন আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু। এই ভাগে স্বয়ং রাসূল ﷺ উপস্থিত ছিলেন। সিদ্ধান্ত মতে এটি মক্কার প্রধান প্রবেশপথের মধ্য দিয়ে আজাখিরের নিকটবর্তী উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে মক্কায় প্রবেশ করার জন্য এগিয়ে যায়।

তৃতীয় ভাগের নেতৃত্ব দেন হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহু। এই দলটি মক্কার দক্ষিণ-পশ্চিম দিক হতে মক্কায় প্রবেশ করবে মর্মে সিন্ধান্ত গৃহীত হয়। আর চতুর্থ ভাগটির নেতৃত্ব দেন হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু। এই দলটি মক্কার দক্ষিণ দিক থেকে মক্কায় প্রবেশ করার জন্য এগিয়ে যায়।

এভাবে মক্কা নগরীকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে সম্মুখে এগিয়ে যায় মুসলিম বাহিনী। যথাসম্ভব যুদ্ধ এড়িয়ে মক্কায় প্রবেশ করার নির্দেশ দিয়ে রাখেন রাসূলুল্লাহ ﷺ। কুরাইশদের কেউ যুদ্ধ করতে না আসলে তার বিরুদ্ধেও যেনো অস্ত্র ধরা না হয়। তিনি মূলত রক্তপাত চাচ্ছিলেন না। শান্তিপূর্ণভাবে মক্কা বিজয় করতে চাচ্ছিলেন। কারণ, স্থানটি হলো হারাম শরীফ। এখানে রক্তপাত নিষিদ্ধ। এবং এই নিষেধাজ্ঞা তৎকালীন মুশরিকরাও মেনে চলত। যদিও রাসূলুল্লাহকে ﷺ সাময়িক সময়ের জন্য হারাম শরীফে রক্তপাতের বৈধতা দেওয়া হয়েছিল, তবুও তিনি তা ছাড়াই মক্কা বিজয় করতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু কুরাইশরা যদি যুদ্ধ শুরু করে দেয় তাহলে ছাড় দেওয়ার কোনো নির্দেশনা ছিল না।

যেহেতু আবু সুফইয়ান পূর্বেই মক্কাবাসীদের হৃদয়ে মুসলিম বাহিনীর একটা ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন তাই মোকাবিলা করার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। ফলে চারটি দলের মধ্যে তিনটিই বিনা রক্তপাতে মক্কায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। শুধু খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে মক্কাবাসীর স্বল্পকালীন একটা খণ্ডযুদ্ধ হয়। ইকরিমাহ বিন আবু জাহল, সাফওয়ান বিন উমাইয়াহ ও সুহাইল বিন আমরের নেতৃত্বে খান্দামায় কুরাইশদের যে বাহিনী প্রতিরোধ করতে অবস্থান গ্রহণ করেছিল, হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত কঠোর হস্তে তাদের দমন করেন। উভয় বাহিনীই যখন অস্ত্রধারণ করে তখন সেখানে স্বল্পকালীন একটা খণ্ডযুদ্ধ সঙ্ঘটিত হয়। যাতে খুনাইস বিন খালিদ বিন রবী’আহ ও কুরয বিন জাবির ফিহরী (রাঃ) নামক দুইজন মুসলিম সেনা শাহাদাত বরণ করেন। অপরদিকে  ১২ জন কুরাইশ সেনা নিহত হয় এ যুদ্ধে। ১২ জন নিহত হওয়ার পর বাকিরা উর্ধশ্বাসে পলায়নপর হয়। পলায়নপর ও পলায়ন-উদ্যত কোনো সৈন্যের পেছনেই আর মুসলিম বাহিনী ধাওয়া করেন নি। কারণ, তারা যথাসম্ভব রক্তপাত এড়াতে চাচ্ছিলেন।

অষ্টম হিজরীর ২০-এ রমাদান। রাসূল ﷺ দশ হাজার সাহাবীকে সাথে নিয়ে বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করলেন। মক্কায় প্রবেশকালে তিনি অহঙ্কারীর ন্যায় প্রবেশ করেন নি। বরং আল্লাহ তা’আলার ঘরের প্রতি আদব ও সম্মান বজায় রেখে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মক্কায় প্রবেশ করেন। বুখারীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, মক্কায় প্রবেশের সময় তিনি উটনীর পিঠে বসে বসে সূরা ফাতহ তিলাওয়াত করছিলেন এবং অতিমাত্রার বিনয়ের ফলে তাঁর মাথা মোবারক এতটাই নিচু হয়ে ছিল যে, তাঁর দাড়ি মোবারক উটের পিঠে লেগে যাচ্ছিল।

বিজয় তখনো সম্পন্ন হয়নি। সবদিক থেকে মুসলিম বাহিনী এক এক করে মক্কায় প্রবেশ করছেন। সময়টা ছিল চাশতের সময়। রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রথমেই আবু তালিবের কন্যা উম্মে হানীর ঘরে প্রবেশ করলেন এবং গোসল সেরে এক সালামে আট রাকাত নফল নামাজ আদায় করলেন। উলামায়ে কেরামের মতে এ নামাজ ছিল সালাতুল ফাতহ বা বিজয়ের নামাজ। যুগে যুগে মুসলিম বীরেরা যখন কোনো শহর বিজয় করেছেন তখন রাসূলের ﷺ এই সুন্নাহ অনুসরণে আট রাকাত সালাতুল ফাতহ আদায় করেছেন।

এরপর তিনি শি’আবে আবী তালিবের দিকে রওয়ানা হন। এখানেই রাসূলের ﷺ জন্য তাবু স্থাপন করা হয়েছে। এটিই হলো সেই স্থান, যেখানে মক্কার মুশরিকরা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবকে তিন বছর বয়কট করে রেখেছিল। বর্তমান যুগের ভাষায় বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব তিন বছরের কারাদণ্ড ভোগ করেছিল এই স্থানেই। মক্কায় প্রবেশের আগের দিন রাসূলকে ﷺ যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, আপনি মক্কায় যাওয়ার পর কোথায় অবস্থান করবেন? তখন তিনি বলেছিলেন, যেখানে কুরাইশ ও বনু কিনানাহর লোকেরা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবকে বয়কট করে রেখেছিল, সেখানে।

মসজিদুল হারামে রাসূলুল্লাহ ﷺ-

বিজয় সম্পন্ন হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সর্বপ্রথম মসজিদুল হারামের দিকে অগ্রসর হন। এসময় তিনি মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। তাঁর ডানে-বামে, সামনে-পেছনে সাহাবায়ে কেরামও অগ্রসর হচ্ছেন মাসজিদুল হারামের দিকে। মাসজিদুল হারামে আগমনের পর তিনি দেখতে পান বাইতুল্লাহর আশপাশে ৩৬০ টি মূর্তি স্থাপিত রয়েছে৷ যে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নিজ হাতে মূর্তি ভেঙেছেন এবং সে অপরাধে(?)তিনি আগুনেও নিক্ষিপ্ত হয়েছেন, সেই ইবরাহীম আলাইহিস সালামের স্মৃতিবিজড়িত বাইতুল্লাহতেই স্থাপন করা হয়েছিল ৩৬০টি মূর্তি। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পর মূর্তি ভাঙার এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি আঞ্জাম দেন রাসূলুল্লাহ ﷺ। তাঁর হাতে একটা ধনুক ছিল, সেটা দিয়ে তিনি মূর্তিগুলোর দিকে ইশারা করছিলেন আর পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতদ্বয় তিলাওয়াত করছিলেন:

‏(‏جَاء الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوْقًا‏) ‏‏[‏الإسراء‏:‏81‏]‏

( جَاء الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيْدُ‏)‏ ‏[‏سبأ‏:‏49‏]‏

“সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। আর মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।” (সূরা আল-ইসরা-৮১)

“সত্য এসে গেছে, নতুন করে মিথ্যার আবির্ভাবও আর ঘটবে না, তার পুনরাবৃত্তিও আর হবে না।” (সূরা সাবা-৪৯)

এভাবে যে মূর্তির দিকেই তিনি ইশারা করছিলেন সেটিই অধোমুখী হয়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল। পৌত্তলিকদের অশুভ বলয়ে শত শত বছর ধরে পবিত্র কা’বার প্রাঙ্গণে যে মূর্তিগুলো স্থাপিত ছিল, তার নাপাক ছায়া থেকে পবিত্র হয় কা’বার প্রাঙ্গণ। এছাড়াও মক্কার বিভিন্ন জায়গায় মূর্তি স্থাপন করা ছিল, যেগুলো বিভিন্ন গোত্রের উপাস্য হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিল। রাসূল ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে পাঠিয়ে সেগুলোও ভেঙে দেন এবং মক্কাকে সম্পূর্ণরূপে মূর্তিপূজা ও মূর্তিপূজকদের থেকে মুক্ত করেন।

অতঃপর তিনি উটের উপর বসেই বাইতুল্লাহর তাওয়াফ সম্পন্ন করেন। যেহেতু তিনি ইহরাম অবস্থায় ছিলেন না তাই হালাল হওয়ার প্রয়োজন ছিল না।

বাইতুল্লাহর ভেতরে রাসূলুল্লাহ ﷺ-

তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ বাইতুল্লাহর ভেতরে প্রবেশ করার মনস্থির করেন। বাইতুল্লাহর চাবি ছিল উসমান ইবনে ত্বালহার কাছে। সে-ই এ চাবি সংরক্ষণ করত এবং সপ্তাহে দু’দিন-সোম ও বৃহস্পতি-বাইতুল্লাহর দরজা খুলত। মক্কী জীবনীতে একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ ভিন্ন একদিনে উসমানকে বাইতুল্লাহর দরজা খুলতে বললে সে তা অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে দেয়। সেদিন-ই রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বলে দেন: উসমান! একদিন এই চাবি আমার হাতে থাকবে। আমি তা যাকে ইচ্ছা তাকেই প্রদান করব। এর প্রতিউত্তরে সে বলেছিল, সেদিনে হয়তো কুরাইশ বংশের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে! তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন: না উসমান! সেদিনই কুরাইশরা প্রকৃত ইযযত ও সম্মান লাভ করবে।

তাওয়াফের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ উসমান ইবনে ত্বালহাকে ডেকে বাইতুল্লাহর দরজা খুলতে বলেন। সে তার মায়ের কাছে যায় চাবি আনতে। তার মা চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানালে সে জোরপূর্বক চাবি এনে রাসূলের (ﷺ) হাতে অর্পণ করে। অতঃপর তাঁর নির্দেশে বাইতুল্লাহর দরজা খোলা হয় এবং তিনি ভেতরে প্রবেশ করেন। মুশরিকরা কা’বাহর ভেতরেও মূর্তি স্থাপন করে রেখেছিল, যেগুলোর মধ্যে হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আঃ)-এর প্রতিকৃতিদ্বয়ও ছিল। ভেতরের দেওয়ালে বিভিন্ন মূর্তির ছবি অঙ্কিত ছিল। তিনি ভেতরের মূর্তিগুলোও অপসারণ করান এবং দেওয়ালও ধুয়েমুছে পরিষ্কার করেন। বাইতুল্লাহর ভেতরে কাঠের তৈরি একটি কবুতরীর প্রতিকৃতিও তাঁর চোখে পড়ে। এ প্রতিকৃতিটি তিনি নিজ হাতে ধ্বংস করেন। এরপর যমযমের পানি দিয়ে বাইতুল্লাহকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করা হলে তিনি সেখানে সালাত আদায় করেন। তখন তাঁর সাথে হযরত উসামাহ ও বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুমা ছিলেন। বাইতুল্লাহর কোনায় কোনায় তিনি আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে আল্লাহ তা’আলার একত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত করেন।

সাধারণ ক্ষমার ঘোষণাঃ-

ইতিমধ্যে তিনি বাইতুল্লাহর বাহিরে কুরাইশদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করলেন। যারা রাসূলুল্লাহকে ﷺ সত্য দ্বীনের প্রচার-প্রসার করার কারণে স্বীয় মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করেছিল, তাঁকে হত্যা করার দুরভিসন্ধি করেছিল, যারা তাঁর বিরুদ্ধে বদর,উহুদ,আহযাবসহ বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের উপর-ই আজ তিনি বিজয়ী হয়েছেন। তাদের ব্যাপারে আজ তিনি কী সিন্ধান্ত নেবেন তাই জানার জন্য সবাই বিপুল আগ্রহ নিয়ে জমা হচ্ছে বাইতুল্লাহর চত্ত্বরে। কানায় কানায় ভরে গেছে বাইতুল্লাহর চত্ত্বর। রাসূলুল্লাহ ﷺ বাইতুল্লাহর ভেতর থেকে বের হয়ে চৌকাঠে দাঁড়ালেন। তাঁর পবিত্র হাতে শোভা পাচ্ছে বাইতুল্লাহর চাবি। উৎসুক জনতাকে সামনে রেখে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন বাইতুল্লাহর চত্ত্বরে। তাঁর চেহারায় কোনো রাগ নাই, ক্ষোভ নাই। শান্ত একটা ভাব ছড়িয়ে তাঁর পবিত্র চেহারাজুড়ে। চির অমলিন মুচকি হাসিটি এখনো দীপ্তি ছড়াচ্ছে তাঁর মুখমণ্ডলে।

এই তো সেই চত্ত্বর, একদিন যেখানে নামাজরত ছিলেন তিনি, আর কমবখত আবু জাহল তাঁর মাথার উপর উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দিয়েছিল! তবুও তিনি শান্ত, স্বর্গীয় জ্যোতিতে উদ্ভাসিত! উৎসুক জনতাকে লক্ষ্য করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন: “হে কুরাইশ জাতি! তোমরা কী মনে কর? আজ আমি তোমাদের সাথে কীরূপ আচরণ করব?” কুরাইশদের পূর্বের সেই দাপট এখন আর নাই। তাদের চেহারা হতে থেকে থেকে অসহায়ত্ব ঝরে পড়ছে। তারা উত্তর দিল “আপনার থেকে আমরা তো মহানুভবতা-ই প্রত্যাশা করছি! ইতিপূর্বেও তো আপনি আমাদের মাঝে মহানুভব-ই ছিলেন!”

 দয়ার নবী, রহমতের নবী অতীতের সবকিছুই ভুলে গেলেন। এই নগরীতে তাঁকে কতভাবেই না কষ্ট দেওয়া হয়েছে! এই মক্কার অলিগলিতে সত্য দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার কারণে তাঁকে কতভাবেই না লাঞ্ছিত করা হয়েছে! সামনে বসে থাকা এই লোকগুলো তাঁকে কতভাবেই না কষ্ট দিয়েছে অপমানিত করেছে, তবুও তিনি সব ভুলে গেলেন! উদারচিত্তে ঘোষণা করলেন: “আজ আমি তোমাদেরকে তা-ই বলব যা ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাঁর ভাইদের বলেছিলেন! আজ তোমাদের কারো প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নাই। যাও, তোমাদের সকলকেই আজ মুক্তি দেওয়া হলো!”

উসমানকেই ফিরিয়ে দেওয়া হলো বাইতুল্লাহর চাবি-

এরপর তিনি মসজিদুল হারামে বসে পড়লেন। বাইতুল্লাহর চাবি তখনো তাঁর হাতেই শোভা পাচ্ছে। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলের কাছে এসে আরজ করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্ব তো আমরা পালন করি! যদি বাইতুল্লাহর চাবিও আমাদেরকে হস্তান্তর করতেন তাহলে দুটি সৌভাগ্যই আমাদের কাছে থাকত! (১)

হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর এই আবেদন শেষ হওয়ার সাথে সাথে হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম সূরা নিসার ৫৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আসলেন। যেখানে ইরশাদ হচ্ছে:

اِنَّ اللّٰہَ یَاۡمُرُکُمۡ اَنۡ تُؤَدُّوا الۡاَمٰنٰتِ اِلٰۤی اَہۡلِہَا ۙ

 “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদিগকে নির্দেশ প্রদান করেন, তোমরা যেনো প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও।”

এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন “উসমান কোথায়? তাকে ডেকে আনা হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তার হাতে বাইতুল্লাহর চাবি অর্পণ করে বললেন:

‏خُذُوْهَا خَالِدَةً تَالِدَةً، لَا يَنْزِعُهَا مِنْكُمْ إِلَّا ظَالِمٌ،

চিরদিনের জন্যই তুমি এ চাবি গ্রহণ কর। তোমার (অর্থাৎ, তোমার বংশের) কাছ থেকে এ চাবি সেই ছিনিয়ে নিবে যে চরম অত্যাচারী হবে।

উসমান যখন চাবি নিয়ে চলে যাচ্ছিল, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে ডাক দিয়ে অতীতের সেই কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তখন উসমান ইবনে ত্বালহা বলে ওঠে: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহ তা’আলার প্রেরিত রাসূল। রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু! (২)

পনেরো জনের ব্যাপারে জারি করা হলো, মৃত্যুর পরওয়ানাঃ-

মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যদিও সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তথাপিও পনেরো জনকে  ক্ষমা করেন নি। তাদের ব্যাপারে তিনি নির্দেশ প্রদান করেন যে, তাদেরকে যদি কা‘বার গিলাফের নীচেও পাওয়া যায় সেখানেই যেনো তাদের হত্যা করা হয়।

তাদের নাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ যথাক্রমে-

১। আবদুল উযযা ইবনে খাতাল। সে প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় হিজরত করেছিল। একবার রাসূল (ﷺ) তাকে যাকাত উত্তোলনের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেন। তার সাথে একজন গোলাম ও একজন আনসারী সাহাবী ছিল। গোলামকে সে খাবার তৈরী করতে বলেছিল। কিন্তু গোলাম কোনো কারণে ঘুমিয়ে পড়ে। নির্দিষ্ট সময়ে খাবার তৈরী হয়নি দেখে ইবনে খাতাল তাকে হত্যা করে ফেলে। পরে যখন বুঝতে পারে যে, এই অপরাধে তাকেও হত্যা করা হবে তখন সে যাকাতের সম্পদসহ মক্কায় পালিয়ে যায় এবং রাসূলের (ﷺ) তিরস্কার ও ভর্ৎসনায় কবিতা রচনা করতে আরম্ভ করে। সুতরাং, তার অপরাধ তিনটি: (১) মুরতাদ হয়ে যাওয়া। (২) যাকাতের মাল আত্মসাৎ করা। (৩) রাসূলকে (ﷺ) তিরস্কার করে কবিতা রচনা করা। তাকে কা’বার পর্দার নীচে হত্যা করা হয়।

২ ও ৩। ইবনে খাতালের দুই দাসী, যারা কবিতার মাধ্যমে রাসূল (ﷺ)-এর বদনাম রটাত। কুরাইশদের যে কোনো আসরে তারা রাসূলের (ﷺ) বদনাম করে কবিতা আবৃত্তি করত। তাদের একজনকে হত্যা করা হয় আরেকজন নিরাপত্তা চাইলে তাকে নিরাপত্তা দিয়ে হত্যার নির্দেশ প্রত্যাহার করা হয়। সে ইসলাম গ্রহণ করে নেয়।

৪। আব্দুল্লাহ বিন সা‘দ ইবনে আবূ সারাহ। প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় হিজরত করেছিল। কাতিবুল ওহী বা ওহী লেখক ছিল। পরবর্তীতে মুরতাদ হয়ে মক্কায় চলে যায়। হযরত উসমান বিন আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুর দুধ ভাই ছিল। ফাতহে মক্কার দিন হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিয়ে রাসূলের (ﷺ) দরবারে আসেন এবং তার থেকেও ইসলামের বাইয়াত গ্রহণ করতে রাসূলের (ﷺ) কাছে আবেদন করেন। তিনি কিছুক্ষণ চুপ থাকার  পর তার থেকেও বাইয়াত গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি সাহাবীদের লক্ষ্য করে বলেছিলেন, আমি যখন চুপ ছিলাম তখন তোমরা কেউ তার গর্দান উড়িয়ে দিলে না কেনো? মোট কথা সে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করে খাঁটি মুসলিম হয়ে যায়। রাদিয়াল্লাহু আনহু!

৫। ইকরিমাহ বিন আবূ জাহল। সে পলায়ন করে ইয়েমেন চলে যাচ্ছিল। জাহাজে আরোহণ করার পর প্রচণ্ড ঝড়-তুফান শুরু হলে সে “লাত ও উযযা” কে ডাকতে আরম্ভ করে। তখন নাবিক তাকে বলে: এখন লাত আর উযযাকে ডেকে কোনো লাভ নেই; এখন এক আল্লাহকে ডাক! ইকরিমাহ বলে: এক আল্লাহকেই যদি ডাকতে হয় তাহলে পালিয়ে যাচ্ছি কোথায়? মুহাম্মাদ (ﷺ) তো এক আল্লাহর দিকেই ডাকছে! এদিকে তার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলের (ﷺ) থেকে ইকরিমাহর জন্য নিরাপত্তা মঞ্জুর করে নিয়েছিল এবং ইকরিমাহর পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে রাসূলের দরবারে নিয়ে আসেন ।  তিনি রাসূলের (ﷺ) দরবারে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করে। রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু!

৬। ওয়াহশী বিন হারব। হযরত হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হত্যাকারী। ফাতহে মক্কার দিন সে পলায়ন করে তায়েফ চলে যায়। পরবর্তীতে মদীনায় পৌঁছে ইসলাম গ্রহণ করে। রাদিয়াল্লাহু আনহু!

৭। হারিস বিন তালাতিল। সে রাসূলের (ﷺ) বদনাম করে কবিতা রচনা করত। ফাতহে মক্কার দিন হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে হত্যা করেন।

৮। হিন্দা বিনতে উতবাহ। কুরাইশ নেতা আবু সুফইয়ানের স্ত্রী। উহুদের দিন হযরত হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহুর কলিজা বের করে চিবিয়েছিল। ফাতহে মক্কার দিন রাসূলের (ﷺ) কাছে এসে ক্ষমা চাইলে তিনি তাকেও ক্ষমা করেন। সে ইসলাম গ্রহণ করে খাঁটি মুসলিম হয়ে যায়। রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা!

৯। মাকীস ইবনে সাবাবাহ। তাকে নুমায়লাহ বিন আব্দুল্লাহ হত্যা করেন। মাকিসও পূর্বে মুসলিম হয়েছিল। কিন্তু পরে এক আনসারীকে হত্যা করে মুরতাদ হয়ে যায়।

১০। হাব্বার বিন আসওয়াদ। হাব্বার বিন আসওয়াদ হচ্ছে সে ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কন্যা যায়নাব (রাঃ)-কে হিযরতের সময় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছিল, যাতে তিনি উটের হাওদা থেকে একটা শক্ত পাথরের উপর পড়ে যান এবং এর ফলে তাঁর গর্ভপাত হয়ে যায়। মক্কা বিজয়ের দিন সে রাসূলের (ﷺ) সামনে এসে দাঁড়ায়। রাসূল (ﷺ) তাকে ক্ষমা করে দেন। সে ইসলাম গ্রহণ করে। রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু!

১১। সারাহ। সে আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানদের মধ্যে কারো দাসী ছিল। এর নিকটেই হাতিব ইবনে আবি বালতা’আহর লিখিত পত্র পাওয়া গিয়েছিল। রাসূলের (ﷺ) কাছে তার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করা হলে তিনি তাকে আশ্রয় দেন। পরে ইসলাম গ্রহণ করে। রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা!

১২। আব্দুল্লাহ বিন যিব’আরী। সে অনেক বড় কবি ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বদনাম করে কবিতা রচনা করত। ফাতহে মক্কার দিন সে পালিয়ে নাজরান চলে যায়। পরবর্তীতে ফিরে আসে এবং ইসলাম গ্রহণ করে। রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু!

১৩। হুবাইরাহ বিন আবু ওয়াহাব মাখযূমী। সেও বড় কবি ছিল এবং কবিতার মাধ্যমে রাসূলের (ﷺ) বিরুদ্ধাচারণ করত। ফাতহে মক্কার দিন পালিয়ে নাজরান চলে যায় এবং সেখানেই কাফির অবস্থায় ইহকাল ত্যাগ করে জাহান্নামবাসী হয়।

১৪। কা’ব বিন যুহাইর। প্রসিদ্ধ কবি ছিল। রাসূলকে (ﷺ) তিরস্কার করে কবিতা রচনা করত। ফাতহে মক্কার দিন পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে মদীনায় উপস্থিত ইসলাম গ্রহণ করে। রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু!

১৫। হুয়াইরিস বিন নুকাইদ৷ বড় কবি ছিল। কবিতার মাধ্যমে রাসূলের (ﷺ) বদনাম রটাত। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে হত্যা করেন। (৩)

এভাবে যাদের ব্যাপারে মৃত্যুর পরওয়ানা জারী হয়ে গিয়েছিল তাদের অনেককেও ক্ষমা করে দেন প্রিয় রাসূল (ﷺ)। ক্ষমাপ্রাপ্ত সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন৷

এছাড়াও মক্কার প্রসিদ্ধ সব কুরাইশ নেতারা এ-দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পিতা আবু কুহাফাহ, আবু লাহাবের ছেলে উতবাহ,সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াহ,সুহাইল ইবনে আমর অন্যতম।

মক্কা বিজয় থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামকে বিজয়ী করাই ইসলামের সবচেয়ে বড় দাওয়াত। ইসলামের ভিত যখন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, কুফরের মেরুদণ্ড তখন ভেঙে যায়। আর তখনই মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে থাকে। কুফরের মেরুদণ্ড সোজা রেখে যতই ইসলামের দাওয়াত প্রদান করা হোক তা ব্যর্থতার ফিরিস্তিকেই শুধু দীর্ঘায়িত করবে। ফাতহে মক্কার শিক্ষা নিয়ে বর্তমান যুগেও মুজাহিদগণ তাই সেই নববী পথেই হাটতে শুরু করেছেন। কুফরের মাথা যতদিন পর্যন্ত উঁচু থাকছে ততদিন পর্যন্ত মুজাহিদগণ স্বস্তির নিশ্বাস নেবেন না মর্মে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন। মক্কা বিজয়ের এই শিক্ষা জাগ্রত হোক প্রতিটি মুমিন-দিলে! আমীন!!

নোটঃ-

(১) হজ্জ্বের মৌসুমে হাজীদের যমযম কূপ থেকে পানি উত্তোলন করে পান করানোর দায়িত্ব আব্বাস ও বনু হাশিমের লোকেরা পালন করত।

(২) আজও কাবার চাবি মক্কার শাইবী গোত্রের লোকদের হাতে বিদ্যমান। এই শাইবী গোত্র হযরত উসমান বিন তালহার রা: চাচাতো ভাই শাইবা বিন উসমান বিন আবী তালহার বংশধর।

ঐতিহাসিক ওয়াকিদীর একটি বর্ণনা মতে হযরত রাসূলে কারীম (ﷺ) মক্কা বিজয়ের দিন কাবার চাবিটি শাইবা ও উসমান উভয়ের হাতে এক সাথে অর্পণ করেছিলেন। চাবিটি তখন উসমান বিন তালহা বিন আবী তালহার হাতে থাকে। তার মৃত্যুর পর উসমানের চাচাতো ভাই শাইবা বিন উসমান বিন আবী তালহা গ্রহণ করেন। তখন থেকে তার অধ:স্তন পুরুষদের হাতে কাবার চাবি বিদ্যমান।

(৩) যাদের ব্যাপারে মৃত্যুর পরওয়ানা জারী করা হয়েছিল সামগ্রিকভাবে তাদের সকলের একটা অপরাধ ছিল রাসূল (ﷺ) কে নিয়ে কটুক্তি করা। এ কারণেই পরবর্তীতে উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ মত পোষণ করেছেন যে, শাতিমে রাসূল (ﷺ) তথা রাসূল (ﷺ) কে নিয়ে কটুক্তি কারীর একমাত্র শাস্তি হলো, মৃত্যুদণ্ড। যদি রাষ্ট্র এই দায়িত্ব পালন না করে তাহলে তা প্রত্যেক  মুমিনের দায়িত্ব।

লেখক : মুফতি আব্দুল্লাহ মুনতাসির


তথ্যসূত্রঃ

(১) সহীহ বুখারী।

(২) তাফসীরে কুরতুবী।

(৩) সীরাতে ইবনে হিশাম।

(৪) যাদুল মা’আদ।

(৫) আর রাহীকুল মাখতুম।

(৬) সীরাতে মুস্তফা।

এছাড়াও সীরাত ও ইতিহাসের উপর রচিত গ্রহণযোগ্য অন্যান্য কিতাব।


পড়ুন আগের পর্বগুলো-

বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ
|| পর্ব-১ ||
সারিয়্যায়ে হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব: ইসলামের প্রথম যুদ্ধাভিজান
https://alfirdaws.org/2022/04/01/56426/

বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ
|| পর্ব-২ ||
ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ: ইসলামের প্রথম বিজয়াভিজান [প্রথম কিস্তি]
https://alfirdaws.org/2022/04/05/56473/

বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ
|| পর্ব-৩ ||
ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ: ইসলামের প্রথম বিজয়াভিযান [দ্বিতীয় কিস্তি]
https://alfirdaws.org/2022/04/09/56561/

বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ ।। পর্ব-৪ ।। ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ: ইসলামের প্রথম বিজয়াভিযান [তৃতীয় কিস্তি] https://alfirdaws.org/2022/04/14/56664/

বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ।।পর্ব-৫।। ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়: আরব উপদ্বীপে পৌত্তলিকদের নাপাক আধিপত্যের অবসান।(প্রথম কিস্তি) https://alfirdaws.org/2022/04/18/56729

বিজয়ের মাস : মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ।।পর্ব-৬।। ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়: আরব উপদ্বীপে পৌত্তলিকদের নাপাক আধিপত্যের অবসান।(দ্বিতীয় কিস্তি) https://alfirdaws.org/2022/04/23/56840/

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন