চাঁদা প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় মালাউন পুলিশ কর্তৃক ছাদ থেকে ফেলে মুসলিম হত্যা

0
782
চাঁদা প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় মালাউন পুলিশ কর্তৃক ছাদ থেকে ফেলে মুসলিম হত্যা

ভারতের উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহরে মালাউন পুলিশের দাবিকৃত চাঁদা না দিতে পারায় এক মুসলিম ব্যবসায়ীকে নির্যাতন করে বাড়ির ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করেছে হিন্দুত্ববাদী পুলিশ প্রশাসন।

নিহত মুহাম্মাদ আক্বিল কুরেশির মেয়ে আলফিয়া (৫) জানায়,”উত্তর প্রদেশের বুলন্দশহরের মোর্চি ওয়ালি গলির নিজ বাড়ির ছাদ থেকে পুলিশ তার বাবাকে বাড়ির ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে।”

সংবাদ প্রতিবেদকে আলফিয়া, পিতা আক্বিল হত্যার ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে সরেজমিনে দেখিয়ে দেয়, হত্যার সময় তার বাবার এক পা এখানে ছিল, আরেক পা ঐখানে ছিল আর পুলিশ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার সময় আক্বিলের মাথা এভাবে ছিল। ঘটনাটি গত মে মাসের ২৩ বা ২৪ তারিখ মধ্যরাতে আনুমানিক ১ টার দিকে ঘটে। আর মাংস বিক্রেতা আক্বিল কুরেশি (৪২) ঘটনার তিন দিন পর, গত ২৭ মে রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

মালাউন প্রশাসন হত্যাকাণ্ডটি ধামাচাপা দিতে জানায়,”পুলিশের একটি দল গরু হত্যা মামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে আক্বিলকে সে রাতে গ্রেফতার করতে গিয়েছিল।”

নিহতের পরিবার জানায়, আক্বিলের কাছে পুলিশ টাকা দাবি করে, কিন্তু আক্বিল তা প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় উত্তেজিত পুলিশ নির্যাতন করে তাকে বাড়ির তিনতলা ছাদ থেকে ফেলে দেয়।

নিহতের এক প্রতিবেশী জানান, আক্বিলের বেশির ভাগ আঘাত মাথায় লেগেছে। ফলে অনুমান করা হচ্ছে তিনি প্রথমে মাথায় চোট পেয়েছেন।

প্রতিবেশির আরেকজন প্রশ্ন ছুড়ে দেন, “কেউ যদি ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে, তবে মাথার পরিবর্তে প্রথমে তার পা মাটিতে আঘাত পাবে, ঠিক?”

আক্বিল কুরেশির বড় মেয়ে সুমাইয়া ও স্ত্রী শাহানা সাংবাদিকদের নিকট পুনরায় ব্যক্ত করেন, টাকা দিতে প্রত্যাখ্যান করায় পুলিশ আক্বিলকে বাড়ির ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দুই মেয়ে আলফিয়া, সুমাইয়া ও স্ত্রী শাহানা ঘটনাটি ঘটার ঐ সময় বাড়ির ছাদেই তখন অবস্থান করছিলেন।

নিহতের পরিবার জানায়, মালাউন পুলিশ আক্বিলের কাছে প্রায়ই টাকা চেয়ে নিতো।
স্ত্রী শাহানা বলেন,”মালাউন পুলিশ আমার স্বামীর কাছে প্রায়ই টাকা চাইলে, তিনি ভয়ে ভয়ে তাদেরকে টাকা দিয়ে দিতেন। কিন্তু তিনি এর বিস্তারিত কারণ আমাদের জানাতেন না।”

আক্বিলের মেয়ে সুমাইয়া জানায়, সে রাতে মালাউন পুলিশ বাড়ির ছাদ থেকে তার বাবাকে ফেলে দিতে সে দেখেছে।

“সে রাতে পুলিশ বাবার কাছে টাকা চায়। যখন তিনি তা দিতে প্রত্যাখ্যান করেন, তখন পুলিশ পিস্তলের বাট দিতে বাবার মাথায় প্রচন্ড আঘাত করতে থাকে। তারপর পুলিশ বাবার পা ধরে টেনে নিয়ে বাড়ির ছাদ থেকে তাকে ফেলে দেয়। তারপর পুলিশ চলে যায়।”

প্রত্যক্ষদর্শী শাহানা জানান,”মালাউন পুলিশ আক্বিলকে চারদিক থেকে প্রথমে ঘিরে ধরে, এবং জামার কলার চেপে ধরে পিস্তলের বাট দিয়ে তার মাথায় সজোড়ে আঘাত করতে থাকে। তারপর বাড়ির ছাদ থেকে তারা তাকে ফেলে দেয়।”

স্ত্রী শাহানা আরো বলেন,”মালাউন পুলিশ দরজায় ঠকঠক করায় আমি দরজা খুলে দেই। তাদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ বাড়ির বাইরে গেইট থেকে এসেছিল, আর কেউ কেউ বাড়ির ছাদে উঠছিল। আমার মেয়েরা তখন বাড়ির ছাদে ছিল। তারা তাদের বাবাকে ছাদ থেকে ফেলে দিতে দেখে ভয়ে কাঁদছিল। উত্তেজিত পুলিশ মেয়েদের কান্না না থামালে তাদেরকেও বাবার মতো ছাদ থেকে ফেলে দেয়ার হুমকি দেয়। পুলিশ আমার সাথেও দুর্ব্যবহার করেছে।”

ভুক্তভোগীর পরিবার বাড়ির ছাদ থেকে প্রতিবেশির বাসায় ফেলে দেয়া আক্বিলের কাছে গিয়ে দেখে আক্বিলের শরীর থেকে অঝোরে রক্ত ঝড়ছে। আহতাবস্থায় আক্বিলকে তারা ঠেলাগাড়িতে করে হাসপাতালে নিতে চেষ্টা করে। মুমূর্ষু অবস্থায় আক্বিলকে অর্ধেক রাস্তা ঠেলাগাড়িকে করে ও বাকি পথ সাইকেলে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

নিহতের স্ত্রী শাহানা জানান,”আক্বিলের কাছে মালাউন পুলিশ প্রায়ই টাকা চাইতো। কোভিড ১৯ লকডাউনের কারণে আক্বিলের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমরা অনেক কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছিলাম।”

শাহানা আরো জানান, পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তিনি ও তার চার মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে বেঁচে থাকা আরো দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে।

নিহত আক্বিলের শ্বাশুড়ি সাংবাদিককে বলেন,”ঘরটি দেখুন। এখানে অল্প জায়গা আছে। আর জায়গাটি আবদ্ধ। বাড়িতে একটিই মাত্র কক্ষ আর ছাদে মাথা গুজার অল্প জায়গা আছে। যদি আমার মেয়ের জামাই পুলিশের দাবী অনুযায়ী দাগি আসামী হতো, তবে তার কি বাংলো বাড়ির মতো উন্নত আবাসন থাকতো না?”

উল্লেখ্য, নিহত আক্বিলের খুর্জা নগর এলাকায় একটি ছোট মাংসের দোকান ছিল। তিনি গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ রুপির মতো উপার্জন করতেন।

নিহতের পরিবার জানায় তারা গত ২৭ শে মে আক্বিলের মৃত্যুর দিনই ভারতের সাব ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট বাড়ির ছাদ থেকে ফেলে দেয়া ও মাথায় পিস্তলের বাট দিয়ে আঘাত করায় সম্পৃক্ত পুলিশ জওয়ান সুনীল, গৌরভ, দীলেন্দ্র, ফরিদ ও অন্যান্যদের নামে দরখাস্ত করেছেন।

দরখাস্তটির অনুলিপি থেকে জানা যায়, হিন্দুত্ববাদী পুলিশ তিন তলা বাড়ির ছাদ থেকে আক্বিলকে ফেলে দেয়। আর ২৭ মে বৃহস্পতিবার রাতে আক্বিলের মৃত্যু ঘটে। দরখাস্তে দোষী পুলিশদের চাকুরী থেকে বরখাস্ত করা ও ভুক্তভোগী পরিবারটিকে আর্থিক সাহায্য প্রদানের অনুরোধ করা হয়।

মানবাধিকার সংস্থা “ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ” গত ১ জুন মঙ্গলবার ভারতীয় মানবাধিকার কমিশনের নিকট “পুলিশের নৃশংসতা” আমলে আনতে একটি পত্র পাঠিয়েছে।

নিহতের পরিবারটি আক্বিল হত্যার ন্যায়বিচার কামনা করে। স্ত্রী শাহানা আক্বিল হত্যায় দোষী পুলিশের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি পিতৃহীন পাঁচ সন্তানদের ক্লেশহীন ভবিষ্যৎ কামনা করেন।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন