বিজয়ের মাস; মাহে রামাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ || পর্ব-১১ || ২২৩ হিজরীর ১৭ রমাদান, বাইজান্টাইনের সর্বাধিক সুরক্ষিত ও অজেয়-খ্যাত আম্মুরিয়া শহর বিজয়। (তৃতীয় কিস্তি)

লেখক : মুফতি আব্দুল্লাহ মুনতাসির

0
274

বাবাক খুররামির শেষ পরিণাম

সেনাপতি আফশিনের অপ্রতিরোধ্য আক্রমণে বাবাক খুররামির মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। দিনে দিনে দুর্বল হয়ে পড়ে তার প্রতিরোধ ব্যবস্থা। কচুকাটা হতে থাকে তার প্রতিরোধ যোদ্ধারা। অবশেষে ২২২ হিজরীর ১০ শাওয়াল বাবাক খুররামি ও তার ভাই আব্দুল্লাহ গ্রেফতার হয়। খুররামিয়াদের শহর বায বিজিত হয়। সেনাপতি আফশিন বিস্তারিত অবস্থা খলিফাকে জানালে তিনি বাবাক খুররামি ও তার ভাই আব্দুল্লাহকে রাজধানী সামাররাতে (১) নিয়ে আসার নির্দেশ দেন। নির্দেশনা মোতাবেক আফশিন বন্দীদের নিয়ে রাজধানী অভিমুখে রাওয়ানা হন এবং ২২৩ হিজরীর ৩ সফর তিনি রাজধানীতে পৌঁছেন। দুর্ধর্ষ এই বিদ্রোহীকে দেখতে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। বাবাককে হাতির উপর বসিয়ে সকলকে দেখার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

খলিফার জল্লাদ উপস্থিত। বাবাক খুররামি নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে। অনুশোচনার লেশমাত্র নেই তার চেহারায়। খলিফার নির্দেশে তার দুই হাত কেটে দেওয়া হলো। তবুও তার মাঝে কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা গেল না৷ একেবারেই শান্ত ও স্বাভাবিক রইল সে, যেন এমনটাই হওয়ার ছিল। খলিফার পরবর্তী নির্দেশে কেটে ফেলা হলো দুই পা৷ এবার দস্তুরমাফিক তার মস্তক কর্তন করা হলো; তার পেট চিড়ে দেওয়া হলো। তার কর্তিত মস্তক পাঠিয়ে দেওয়া হলো খোরাসানে, আর মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হলো শূলে। তার ভাইকেও একই পদ্ধতিতে হত্যার নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হলো বাগদাদে। দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ পরে ইসলামী খিলাফত মুক্ত হলো দুর্ধর্ষ এক বিদ্রোহীর হিংস্র থাবা থেকে৷

একটি সংক্ষিপ্ত খতিয়ান

প্রসিদ্ধ ইতিহাসবিদ ইবনু জারির তাবারি (মৃত্যু: ৩১০ হিজরী মোতাবেক ৯২৩ খ্রিস্টাব্দ) তার তারিখের মধ্যে লিখেছেন, ২০১ হিজরীতে বাবাক খুররামির উত্থানের পর থেকে ২২২ হিজরীতে গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত ২ লক্ষ ৫৫ হাজার ৫ শত নিরীহ মানুষকে সে হত্যা করেছে। খিলাফতের নামজাদা ৬ জন সেনাপতিকে সে পরাজিত করেছে, যাদের দু’জনকে হত্যাও করেছে। তার কয়েদখানা থেকে ৭ হাজার ৬ শত নিরপরাধ নারী ও শিশুকে মুক্ত করা হয়েছে।

আম্মুরিয়া অভিমুখে যুদ্ধযাত্রা

আম্মুরিয়া বর্তমান তুরষ্কের ফ্রিজিয়া অঞ্চলে অবস্থিত একটি শহর, যার পরিবর্তিত নাম আমোরিয়াম৷ শহরটি তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান নগরী হিসেবে বিবেচিত হত।

জুমাদাল উলা, ২২৩ হিজরীতে খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ ৮০ হাজার সেনার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে আম্মুরিয়া অভিমুখে যাত্রা করেন। ইতিহাসবিদগণ লিখেছেন, এই যুদ্ধে খলিফা এত বিশাল বাহিনী একত্রিত করেছেন যে, ইতিপূর্বে কোনো খলিফা এত বিশাল বাহিনী একত্রিত করতে পারেননি। এমনকি তিনি যে পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র সাথে নিয়েছেন, ইতিপূর্বে কোনো যুদ্ধের জন্য এত অস্ত্রশস্ত্রও কেউ সাথে নিতে পারেননি। শুধু তাই নয়, যে সময় তিনি যুদ্ধের জন্য যাত্রা করেন, তৎকালীন সমরবিদদের ধারণামতে এত গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের জন্য সময়টি কোনোভাবেই উপযুক্ত ছিল না। সমরবিদদের পক্ষ থেকে তাই বারবার খলিফাকে অনুরোধ করা হচ্ছিল, যেন এমন নাজুক মুহূর্তে যুদ্ধাযাত্রা না করেন৷ কিন্তু তিনি কারো কোনো কথাই আমলে নেননি৷ প্রতিশোধের আগুন তাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছিল। তাই কোনো কিছুতেই তিনি দেরি সইতে পারছিলেন না।

নেতৃত্বের দায়িত্ব অর্পিত হলো যাদের কাঁধে

অগ্রবর্তী বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া হয় সেনাপতি আবু জাফর আশনাসকে। ডান অংশের দায়িত্ব দেওয়া হয় সেনাপতি ইতাখ খাযারিকে। জাফর ইবনে দীনারকে দেওয়া হয় বাম অংশের দায়িত্ব। আর মধ্যভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয় সেনাপতি উজাইফ ইবনে আনবাসাকে। পৃথক দুটি বাহিনী তৈরী করে একটির দায়িত্ব দেন সেনাপতি আফশিনকে, আর অপরটির দায়িত্ব তুলে নেন খলিফা নিজে।

আনকারা বিজয়

আম্মুরিয়ার যাওয়ার পথে রোমানদের গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর হলো আনকারা। আম্মুরিয়া বিজয়কে নিষ্কণ্টক করতে আনকারা বিজয় ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই খলিফা সর্বপ্রথম আনকারা বিজয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তিনটি বাহিনী তিন দিক থেকে অগ্রসর হয়ে আনকারা অবরোধ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরিকল্পনা মোতাবেক পূর্ব দিক থেকে আফশিনের বাহিনী, পশ্চিম দিক থেকে আশনাসের বাহিনী আর সোজা পথ ধরে এগিয়ে যায় স্বয়ং খলিফার বাহিনী। সেনাপতি আফশিন ও আশনাসকে বার্তাবাহকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে থাকেন খলিফা।

বসে নেই বাইজান্টাইন বাহিনী

বাইজান্টাইন অভিমুখে এত বিশাল মুসলিম বাহিনী ধেয়ে আসার সংবাদ গোপন থাকেনি৷ গোপন রাখা সম্ভবও ছিল না। বিদ্যুতের গতিতে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে শত্রু শিবিরে। গোয়েন্দা মারফত সম্রাট তোফাইল ইবনে মিখাইল জানতে পারে দুটি বাহিনীর কথা। পূর্ব দিক থেকে অগ্রসরমান আফশিনের বাহিনী সম্পর্কে তখনও কিছুই জানতে পারেনি তোফাইল। ফলে সম্রাট তার বাহিনীকে দু’ভাগে বিভক্ত করে আশনাস ও খলিফার পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকে। বাইজান্টাইন বাহিনীর এই প্রস্তুতির সংবাদ খলিফা জানতে পেরে সতর্ক হয়ে যান এবং দূত মারফত সতর্ক করে দেন আশনাসকেও। কিন্তু খলিফার দূত পৌঁছানোর আগেই আফশিন এগিয়ে গেছেন অনেক দূর। পূর্ব দিক থেকে আফশিন যখন আনকারার দ্বার প্রান্তে, বাইজান্টাইন সম্রাট তখন জানতে পারে তার সম্পর্কে। খুব দ্রুত সে কৌশল পরিবর্তন করে নিজে একটি বাহিনী নিয়ে আফশিনের মোকাবেলায় দ্রুত ছুটে যায়।

যুদ্ধ

২৫ শাবান ২২৩ হিজরী মোতাবেক ২২ জুলাই ৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে আনকারার উপকণ্ঠে বাইজান্টাইন বাহিনী ও মুসলিম বাহিনীর মাঝে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। দীর্ঘ সফরে মুসলিম বাহিনী ছিল ক্লান্ত-শ্রান্ত। বিপরীতে বাইজান্টাইন বাহিনী ছিল পূর্ণ বলবান। প্রথম দিকে মুসলিম বাহিনী কিছুটা দুর্বল হয়ে যায়। মুসলিম বাহিনীর কাতারগুলি তছনছ হয়ে যেতে থাকে। কিন্তু পরক্ষণেই অশ্বারোহী বাহিনী বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রু-সারিতে। মরণপণ লড়ে যান কিছুক্ষণ। অশ্বারোহী বাহিনীর এই ত্যাগ বৃথা যায়নি৷ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে বাইজান্টাইন সেনাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এমন সময় হঠাৎ একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, বাইজান্টাইন সম্রাট তোফাইল মারা গেছে৷ এই গুজবে বাইজান্টাইন সেনাদের অবশিষ্ট মনোবলটুকুও হারিয়ে যায়৷ শত্রুবাহিনী রণে ভঙ্গ দেয়। আনকারা বিজয় সম্পন্ন হয়। সেনাপতি আফশিন খলিফাকে সুসংবাদ জানিয়ে পত্র লিখেন। খলিফা তাকে মোবারকবাদ জানান। আনকারা বিজয় করে তারা সেখানে কয়েক দিন অবস্থান করেন।


চলবে ইনশাআল্লাহ….

টিকা:
(১) এটি বাগদাদ থেকে ১২৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত একটি শহর। ২২১ হিজরীতে খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ শহরটি নির্মাণ করেন। তখন এর নাম রাখা হয় সুররা মান রাআ, যা পরবর্তী সময়ে সামাররা নামে প্রসিদ্ধ হয়। মুতাসিম বিল্লাহ খিলাফতের রাজধানীকে বাগদাদ থেকে এখানে স্থানান্তর করেন। এর কারণ হিসেবে উক্ত অঞ্চল থেকে স্থায়ীভাবে বিদ্রোহ দমন করার কথা উল্লেখ করা হয়।

তথসূত্রঃ
(১) https://ar.m.wikipedia.org/wiki/%D9%85%D8%B9%D8%B1%D9%83%D8%A9_%D8%B9%D9%85%D9%88%D8%B1%D9%8A%D8%A9
(২) তারিখে তাবারী
(৩) আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া
(৪) আল-কামিল ফিত তারিখ
(৫) তারিখে ইবনে খালদুন


আগের পর্বগুলো পড়ুন :

১। বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ
|| পর্ব-১ ||
সারিয়্যায়ে হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব: ইসলামের প্রথম যুদ্ধাভিজান
https://alfirdaws.org/2022/04/01/56426/

২। বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ
|| পর্ব-২ ||
ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ: ইসলামের প্রথম বিজয়াভিজান [প্রথম কিস্তি]
https://alfirdaws.org/2022/04/05/56473/

৩। বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ
|| পর্ব-৩ ||
ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ: ইসলামের প্রথম বিজয়াভিযান [দ্বিতীয় কিস্তি]
https://alfirdaws.org/2022/04/09/56561/

৪। বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ ।। পর্ব-৪ ।। ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ: ইসলামের প্রথম বিজয়াভিযান [তৃতীয় কিস্তি]
https://alfirdaws.org/2022/04/14/56664/

৫। বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ।।পর্ব-৫।। ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়: আরব উপদ্বীপে পৌত্তলিকদের নাপাক আধিপত্যের অবসান।(প্রথম কিস্তি)
https://alfirdaws.org/2022/04/18/56729

৬। বিজয়ের মাস : মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ।।পর্ব-৬।। ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়: আরব উপদ্বীপে পৌত্তলিকদের নাপাক আধিপত্যের অবসান।(দ্বিতীয় কিস্তি)
https://alfirdaws.org/2022/04/23/56840/

৭। বিজয়ের মাস; মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ।।পর্ব-৭।। ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়; আরব উপদ্বীপে পৌত্তলিকদের নাপাক আধিপত্যের অবসান।(শেষ কিস্তি)
https://alfirdaws.org/2022/05/01/56964/

৮। বিজয়ের মাস; মাহে রামাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ।। পর্ব-৮।। ১৩ হিজরীর ১২ রমাদান, ঐতিহাসিক বুওয়াইবের যুদ্ধে পারস্য বাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর অবিশ্বাস্য বিজয়।
https://alfirdaws.org/2023/03/26/62805/

৯। বিজয়ের মাস; মাহে রামাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ || পর্ব-৯ || ২২৩ হিজরীর ১৭ রমাদান, বাইজান্টাইনের সর্বাধিক সুরক্ষিত ও অজেয়-খ্যাত আম্মুরিয়া শহর বিজয়। (প্রথম কিস্তি)
https://alfirdaws.org/2023/04/02/62870/

১০। বিজয়ের মাস; মাহে রামাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ || পর্ব-১০ || ২২৩ হিজরীর ১৭ রমাদান, বাইজান্টাইনের সর্বাধিক সুরক্ষিত ও অজেয়-খ্যাত আম্মুরিয়া শহর বিজয়। (দ্বিতীয় কিস্তি)
https://alfirdaws.org/2023/04/13/62951/

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধশাইখ সামি আল-উরাইদি: পশ্চিমাদের জন্য মূর্তিমান এক আতঙ্কের নাম
পরবর্তী নিবন্ধআল-ফিরদাউস নিউজ বুলেটিন || এপ্রিল ৩য় সপ্তাহ, ২০২৩ঈসায়ী